রাজনীতি

গাজীপুর সিটিতে প্রকাশ্যে জাহাঙ্গীর, ভেতরে ক্ষোভ: মান্নানের নিষ্ক্রিয়তার সুবিধায় হাসান

বার্তাবাহক ডেস্ক : গাজীপুরে এখন আওয়ামী লীগ মানেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক এবং এমপি জাহিদ আহসান রাসেল। মোজাম্মেল হক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আর জাহিদ আহসান রাসেল জনপ্রিয় নেতা শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টারের ছেলে। এই সুবাদে মোজাম্মেল-রাসেলের অনুগতরাই জেলা-মহানগর আওয়ামী লীগসহ অঙ্গসংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। শুধু মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পান জাহাঙ্গীর আলম। এ অবস্থায় জাহাঙ্গীর আলমের মেয়রের টিকিট পাওয়াকে মোজাম্মেল-রাসেলপন্থিরা খুশি মনে নেননি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কেন্দ্রের ভয়ে জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা প্রকাশ্যে জাহাঙ্গীরের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন, গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন। রাজনীতির মাঠেও সরব। কিন্তু নিজস্ব বলয়ের নেতাকর্মী ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন না। এমনকি গাজীপুরের নির্বাচনী হাওয়া নিয়ে সারাদেশে যখন আলোচনা সেসময়ে খাঁ-খাঁ করছে গাজীপুরে আওয়ামী লীগ কার্যালয়।

জাহাঙ্গীর আলম যখন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সে সময়ে (বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটা) ঘুমাচ্ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ।

নেতাকর্মীরা বলছেন, সবাই জাহাঙ্গীরের হয়ে কাজ করছে। তবে সেটা মুখে-মুখে। ভেতরে ভেতরে অধিকাংশ নেতাই চান না জাহাঙ্গীর আলম মেয়র পদে আসুক। আওয়ামী লীগের গৃহদাহে গত ২৯ মার্চ সদর উপজেলার পিরুজালী, ভাওয়াল মির্জাপুর ও ভাওয়াল গড় ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র একটিতে জয় পায় আওয়ামী লীগ, দুটিতেই বিএনপি।

জ্যেষ্ঠ নেতারা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে নাম প্রকাশ করতে না চাইলেও মহানগর যুবলীগের নেত্রী শেখ আসমা আক্তার মুন্নী ক্ষোভের সুরে বলেন, উন্নয়নের জন্য গাজীপুরে মানুষ নৌকাকেই ভোট দেবে। এর পরও কোনো বিপর্যয় হলে তাতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারাই দায়ী থাকবেন। এখনো সময় আছে সবার উচিত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করা।

জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, গাজীপুরের রাজনীতিতে জাহাঙ্গীর আলম পরিচিত কোনো মুখ নন। কেন্দ্রের এক জ্যেষ্ঠ নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার সুবাদে সিনিয়রদের টপকে মনোনয়ন পান। এতে ভেতরে ভেতরে আ.ক.ম মোজাম্মেল হক ও জাহিদ আহসান রাসেল গ্রুপের কেউ চাচ্ছেন না জাহাঙ্গীর জনপ্রতিনিধি হোক। এ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত ২৯ এপ্রিল জেলা ও মহানগর কমিটির একাধিক নেতাকে ঢাকায় ডেকে জাহাঙ্গীরের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিরুদ্ধাচরণের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন।

স্থানীয় নেতাকর্র্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ গাজীপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হলেও গাজীপুরে তার পরিবারের দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান কোনো শক্ত গ্রুপিং বা সিন্ডিকেট নেই। সোহেল তাজ দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাইরে। তাজউদ্দীনকন্যা সিমিন হোসেন রিমির রাজনীতি তার নির্বাচনী এলাকা কাপাসিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকিও তার নির্বাচনী এলাকা কালীগঞ্জ, সদর উপজেলার পূবাইল নিয়ে ব্যস্ত। এ সুযোগে মোজাম্মেল হক ও রাসেলের পছন্দের লোকজনই জেলা ও মহানগর কমিটিতে স্থান পেয়েছেন।

আ.ক.ম মোজাম্মেল হক জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিও। স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্রমতে, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ, মহানগর সভাপতি আজমত উল্লাহ খান, মহানগর সিনিয়র সহসভাপতি রিপন সরকার তার গ্রুপের। তবে তারা শক্তিশালী ও ত্যাগী নেতাও বটে।

মহানগর কমিটিতে জাহিদ আহসান রাসেলের আধিপত্য। মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি কাজী আলীমুদ্দিন বুদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ইলিয়াস, মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান রাসেল, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি রঞ্জিত কুমার মল্লিক, সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন, ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম দীপ সবাই রাসেলপন্থি। এতসব নেতার মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুজিবুর রহমান জাহাঙ্গীরের সঙ্গে রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।

গাজীপুর ঘুরে দেখা গেছে, রাত-দিন মাঠ চষে জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে ভোট চাইছেন মোজাম্মেল-রাসেল গ্রুপের নেতারা। জনসংযোগে জাহাঙ্গীর আলমের পাশে আছেন। স্লোগান দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নৌকা প্রতীক বিজয়ী করতে একাগ্রতা। যদিও অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলমের দাবি সবাই তার সঙ্গে রয়েছে। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে শুধু আওয়ামী লীগই নয়, জোটের নেতারাও আছেন। সবাই একযোগে নৌকার পক্ষে কাজ করছেন। গাজীপুরে আওয়ামী লীগে কোনো গ্রুপিং বা বিরোধিতা নেই।

এদিকে গ্রুপিং-কোন্দল থাকলেও অধ্যাপক এমএ মান্নানের অসুস্থতার কারণে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী। আওয়ামী লীগের মতো গাজীপুরে হাসানউদ্দিন সরকার, অধ্যাপক এমএ মান্নান ও ফজলুল হক মিলন গ্রুপ শক্তিশালী। তবে মেয়র পদের প্রার্থিতা নিয়ে সরকার পরিবার এবং এমএ মান্নান দুই পথে হাঁটছিলেন। জেলার জ্যেষ্ঠ নেতারা যে যার মতো করে পকেট কমিটি ঘোষণা দিতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে। এতে মহানগর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন চলছে বহু আগে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে। জেলা কমিটির একই অবস্থা। নতুন করে কমিটি না হওয়ায় মান্নান বা সরকার যাই হোক সব গ্রুপের তরুণ নেতাকর্মীরা হতাশ।

আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডে হাসানউদ্দিন সরকার পরিবারের নুরুল ইসলাম সরকার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত। আবার দলের টিকিট পেয়ে মেয়র হলেও বারবার কারান্তরীণ হয়ে খুব একটা সময় চেয়ারে বসতে পারেননি। বর্তমানে তিনি অসুস্থ হয়ে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। এ কারণে মান্নান গ্রুপের নেতাকর্মীরা রাগ-ক্ষোভ ভুলে ফাঁকা মাঠে হাসান সরকারের পক্ষে কাজ করছেন।

হাসানউদ্দিন সরকার বলেন, গ্রুপি-লবিং বুঝি না। ম্যাডামের নির্দেশে, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে দলীয় নেতাকর্মী, সাধারণ ভোটার সবাই ধানের শীষের পক্ষে আছে।

গাজীপুরে গণসংযোগ ও পথসভা করতে এসে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, এখানে বিএনপিতে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। বরং আওয়ামী লীগের মধ্যে কোন্দল, একই ওয়ার্ডে একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে।

 

সূত্র: আমাদের সময়

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close