রাজনীতি

ঈদের উৎসবের আমেজ নির্বাচনেও দেখতে চান জাহাঙ্গীর-হাসান

বার্তাবাহক ডেস্ক : তাঁদের দুজনের আজ দেখা হয়তো হতোই না। দুজনেই ব্যস্ত থাকতেন নিজদের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে, নিজেদের বলয়ে। একটি বিয়োগান্ত ঘটনা তাঁদের সাক্ষাতের সুযোগ করে দিল। যে দুজনের কথা বলা হচ্ছে, তাঁরা হলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম।

২৬ জুন এই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। দুই নেতা কেমন করে কাটাচ্ছেন তাঁদের এ উৎসবের দিনটি, তা দেখতেই শনিবার ঈদের দিনের সকালে গাজীপুর যাওয়া।

যাওয়ার পথেই শুনলাম, শুক্রবার ঈদের ঠিক আগের রাতে টঙ্গীর মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা কাজী নূর মোহাম্মদ মারা গেছেন। শনিবার সকালে টঙ্গীর আনারকলি সড়কে তাঁর জানাজা হচ্ছে। দুই নেতা সেখানেই আছেন। গিয়ে পাওয়াও গেল তাঁদের। আজকের উৎসবের দিনে এলাকার এই বিশিষ্ট মানুষটির মৃত্যুর পর তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন হাসান সরকার ও জাহাঙ্গীর আলম। দুজনে দেখা হওয়ার পর ঈদের শুভেচ্ছাও বিনিময় করলেন। কোলাকুলি করলেন। পরে জানাজায় শরিক হলেন। কথাও বললেন প্রয়াত ব্যক্তির প্রতি তাঁদের শোকবার্তা জানিয়ে।

bartabahok
মুক্তিযোদ্ধা কাজী নূর মোহাম্মদের জানাজায় মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ও হাসান উদ্দিন সরকারসহ স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।

দুই মেয়র প্রার্থী শুধু নন, টঙ্গীর একাধিকবারের মেয়র আজমতউল্লা খান, এলাকার সাংসদ মো. জাহিদ হাসান রাসেল, সাবেক সাংসদ কাজী মোজাম্মেল হকও উপস্থিত ছিলেন কাজী নূর মোহাম্মদের জানাজায়। তাতে শরিক হন হাজারো মানুষ। দুই মেয়র প্রার্থী সামনে যাঁকে পেলেন, তাঁর সঙ্গেই কুশল বিনিময় করলেন। এরপর দুজনের যাত্রাপথ ভিন্ন হলো।

শুক্রবার সন্ধ্যায় দুই মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে কথা হয়েছিল এ প্রতিবেদকের। জানিয়েছিলেন আজ কী করবেন তা নিয়ে। সেই হিসেবে পুরো সিটি করপোরেশন এলাকার সাতটি থানায় ঘুরে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথা ছিল জাহাঙ্গীর আলমের। জানাজা শেষ করে তিনি ছুটলেন সিটির হারিকেন এলাকার নিজের বাড়িতে। যাওয়ার পথে জাহাঙ্গীর জানালেন, বাড়িতে অপেক্ষায় তাঁর আত্মীয়স্বজন, নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীরা। প্রতিবারের মতো এবারের ঈদটি কতটা পৃথক? জাহাঙ্গীর বলেন, প্রতিবছর ঈদে পরিবারের চেয়ে নেতা-কর্মীদের সঙ্গেই বেশি কাটে। এবারও তাই। তবে এবার রমজান মাস যে কেমন করে কাটল, তা টের পাননি। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছুটতে হয়েছে তাঁকে।

জাহাঙ্গীর বললেন, ‘প্রতিবছর কিছু না কিছু কেনাকাটা করি পরিবারের সবার জন্য। এবার কিছু কেনার সময় পাইনি। মেয়ের জন্য কেনাকাটা করেছেন আম্মা।’

খুলনার সঙ্গে গাজীপুর সিটির নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ১৫ মে। তবে সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়নের ছয়টি ইউনিয়ন গাজীপুর সিটিতে অন্তর্ভুক্তির প্রজ্ঞাপন ও সিটির নির্বাচনের তফসিল চ্যালেঞ্জ করে করা রিটে ৬ মে এ সিটির নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন হাইকোর্ট। এ আদেশের বিরুদ্ধে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী এবং নির্বাচন কমিশন তিনটি পৃথক আবেদন করেন। এ নিয়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে ২৮ জুনের মধ্যে নির্বাচন করার আদেশ দেন। পরে নির্বাচন কমিশন ২৬ জুন নির্বাচনের তারিখ ঠিক করে। প্রার্থীদের প্রচারের সুযোগ মিলছে ১৮ জুন থেকে।

তবে গাজীপুরের প্রধান দুই প্রার্থী সাক্ষাৎ-শুভেচ্ছা বিনিময়ের মতো কাজগুলো করে গেছেন। জাহাঙ্গীর যেমন বললেন, ‘কোনো দিন চার-পাঁচ শ মানুষ ছাড়া ইফতার বা সাহ্‌রি করি নাই। এগুলো ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। কোথাও তো ভোট চাই নাই।’

bartabahok
এক শিশুকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম।

গাজীপুরের হারিকেনে বাড়িতে নামতেই জাহাঙ্গীরকে ঘিরে ধরেন অপেক্ষমাণ নেতা-কর্মীরা। তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য ঢাকা থেকেও এসেছেন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদকর্মীরা। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে তাঁদের নিয়ে চারতলার বাড়িটির তৃতীয় তলায় চলে যান।

শনিবার সকালে নিজেদের আদিবাড়ী জয়দেবপুরে দাদা-বাবার কবর জিয়ারতের মধ্যে দিন শুরু করেন জাহাঙ্গীর। সেখান থেকে যান জয়দেবপুর রাজবাড়ী মাঠে ঈদের জামাতে। পরে আরও দুটি জামাতে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এরপর হারিকেনের এই বাড়িতে প্রথম আসা। এসেই অতিথিদের খাবার দিতে তোড়জোড় শুরু করলেন। জাহাঙ্গীর আলম তাঁর মায়ের হাতের রান্না মুরগির মাংস, গরুর মাংস, ট্যাংরা মাছ দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। সঙ্গে পোলাও আর সাদা ভাত। খাওয়ার পরই ছুটলেন গাছা, বোর্ড বাজার, জয়দেবপুর ও শেষে নিজ গ্রাম কানাইয়ায়।

হাসান সরকারের ঈদে ব্যস্ত বাড়িতে

টঙ্গীর আউচপাড়ার সরকার বাড়ি এ তল্লাটে চেনে না, এমন লোক মেলা দুষ্কর। সেই বাড়ির মানুষ বর্ষীয়ান নেতা হাসান সরকার এবার প্রার্থী। কিন্তু টঙ্গী পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হাসান সরকারের কাছে এবারের ঈদ ভিন্ন রকম নয়, থাকুক না সামনে নির্বাচন। বললেন, ‘৪০ বছর ধরে এভাবেই চলছে। নির্বাচনের আগে ঈদ পড়েছে, এমন আগেও হয়েছে। সব সময় মানুষের সঙ্গে থাকি। ঈদের দিনে আত্মীয়-পরিজন থাকে বটে। তবে নেতা-কর্মীদেরই সময় দিতে হয় বেশি।’

bartabahok
নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার।

শনিবার সকাল আটটায় টঙ্গীর পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে ঈদের নামাজ পড়েন হাসান সরকার। এরপর বাড়িতে চলে আসেন। সেখানে জড়ো হওয়া নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। কথা বলেন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে। পরে জানাজা থেকে ফিরে সরাসরি বাড়ি চলে আসেন। বেলা পৌনে একটার পর দুপরের খাবার খেয়ে তিনি বিশ্রাম নিতে যান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এবার তাঁর বাসায় গিয়ে শুনতে পাই তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। তিনটার দিকে যেতে বলা হয়।

সময়মতো এ তল্লাটের আন্দোলন ও নির্বাচনের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ বাড়িটিতে গিয়ে চোখে পড়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের ভিড়। প্রথমেই এলেন ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। এঁদের মধ্যে কয়েক নেতা সদ্য কারামুক্ত হয়েছেন। ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন হাসান সরকারকে।

জাহাঙ্গীর যেমন আজ বিভিন্ন এলাকায় ছুটেছেন, হাসান সরকার কিন্তু তেমনটা করেননি আজ। তেমনটা করেনও না। এমনকি ঈদের দিন ঢাকার কোনো অনুষ্ঠানেও যান না, বললেন বিএনপির প্রার্থী হাসান সরকার। বাড়ির পেছনে প্যান্ডেল হয়েছে। সেখানে আসা দলীয় নেতা-কর্মী বা অন্য অতিথিরা আপ্যায়িত হচ্ছেন। সেমাই, খাসি, গরু ও মুরগির মাংসের ব্যবস্থা হয়েছে তাঁদের জন্য, জানান এ বাড়ির এক সদস্য।

যখন হাসান সরকারের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখনই টঙ্গীর বর্তমান বিএনপি দলীয় মেয়র আবদুল মান্নানের ফোন এল। শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন তাঁর সঙ্গে। ছাত্রদলের নবীন কর্মীদের সেলফির আবদারও মেটাতে হচ্ছে ৭১ বছর বয়সী এ নেতাকে।

bartabahok
ঈদের দিন ব্যস্ত সময় পার করেন মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম। টেলিভিশন ও পত্রিকায় সাক্ষাৎকারও দিতে হয়েছে তাঁকে।

হাসান সরকার জানান, পুরো রমজান মাস গেছে ব্যস্ততায়। ধর্মীয় নেতা, দলীয় নেতা-কর্মীসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষদের সঙ্গে তিনি বসেছেন।

জাহাঙ্গীর বলেছিলেন, রোজার মধ্যে এক দিন ইফতার করতে হাসান সরকারকে দুবার আমন্ত্রণ জানান তিনি। পরে সময় দেওয়ার কথা বলেছিলেন হাসান সরকার। আজ জাহাঙ্গীরের এই আমন্ত্রণের কথা স্বীকার করেন হাসান সরকার। জানা গেল, দুই নেতা ঈদের শুভেচ্ছা কার্ডও বিনিময় করেছেন।

দেয়ালে কাঠ সাঁটানো সরকার বাড়ির বৈঠকখানায় ভিড় বাড়তে থাকে। বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা আসতে থাকেন। হাসান সরকার বললেন, ‘আজ আর বাইরে যাব না। অনেকে আসবে। তাঁদের জন্য আছি।’

পুরোনো পাঞ্জাবিতে ঈদ করছেন হাসান-জাহাঙ্গীর

ঈদে নতুন পাঞ্জাবি পরা একরকম রীতিই। জাহাঙ্গীর আলমকে আগেও দেখেছি এক বিশেষ ধরনের পাঞ্জাবি পরেন। সাদা পাঞ্জাবির হাতে ও বুকে কালো বর্ডার। পুরোনো নাকি? জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এই একই রকমের পাঞ্জাবি তাঁর কয়েকটা আছে। নেত্রী তো (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) একবার বললেন, তোমাকে কয়েকটা পাঞ্জাবি কিনে দিই।’ তবে জাহাঙ্গীর জানান, আজ যেটা পরেছেন তা পুরোনোই। নতুন করে এবার কেনা হয়নি।

প্রধান প্রতিপক্ষ হাসান সরকার ঈদের দিন সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরেছিলেন। সেটিও পুরোনো বলে জানান তিনি। এক চাচাতো ভাই কয়েকটি দিয়েছে, তবে তা পরতে পারেননি।

bartabahok
নিজ বাড়িতেই নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন হাসান উদ্দিন সরকার। তাঁর সঙ্গে সেলফি তুলছেন এক তরুণ কর্মী।

পুরোনো পাঞ্জাবিতে ঈদ কাটানো এই দুই নেতা কিন্তু একটা সাধারণ বিষয়ে আশাবাদী—তাঁরা নিশ্চিত বিজয়ী হবেন। বিএনপির প্রার্থী হাসান সরকার বললেন, ‘বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত।’ আর জাহাঙ্গীর বললেন, ‘গাজীপুরের মানুষ আমাকে ভোট দেবে বলে আমার বিশ্বাস।’

দুজনের আরেকটি অভিন্ন বিশ্বাস, গাজীপুরের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। হাসান সরকার বললেন, ‘এখানে ভোট ভালো হবে আমি বিশ্বাস করি।’ আর জাহাঙ্গীরের কথা, ‘আমি ৯০–এর পরের প্রজন্মে কোনো খারাপ নির্বাচন গাজীপুরে দেখিনি। এবারও হবে না।’

ঈদের এই উৎসবের আমেজকে ভোটের উৎসব পর্যন্ত নিয়ে যেতে চান দুই নেতা। নিশ্চয়ই দেশের বৃহত্তম সিটি করপোরেশনের মানুষও তা–ই দেখতে চায়।

 

সূত্র:প্রথম আলো

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close