অর্থনীতিআলোচিত

ব্যাংকঋণ ফেরত দেননি, জামানতের পাট নেই খেলাপিদের গুদামে?

বার্তাবাহক ডেস্ক : চারপাশে পুরনো টিন দিয়ে ঘেরা তালাবদ্ধ একটি ঘর। রোদ কিংবা বৃষ্টির পানি ঠেকানোর জন্য উপরে নেই কোনো চালা। দেখতে পরিত্যক্ত মনে হলেও এটিই খুলনার খালিশপুরের পাট ব্যবসায়ী মোনাজাত আলীর পাটের গুদাম। এ গুদামের পাট জামানত দেখিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তিনি।

২০১৭ সালে গুদামটি পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিদর্শক দল তখন এ ব্যবসায়ীর মেসার্স বিসমিল্লাহ জুট ট্রেডিংয়ের গুদামে পাট পেয়েছিল মাত্র ৫ শতাংশ। এতদিনে তা-ও নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ কথা ছিল, গুদামজাত পাট বিক্রি করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবেন মোনাজাত আলী। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি, ব্যাংকঋণ ফেরত দেননি। তার গুদামেও নেই কোনো পাট।

মোনাজাত আলীর মতোই খালিশপুরের আরেক পাট ব্যবসায়ী মো. বেলাল। মেসার্স এসবি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি পাট রফতানির প্রতিষ্ঠান আছে তার। পুরনো দিনের গ্রামীণ যাত্রাপালার প্যান্ডেলের মতোই একটি পাটের গুদাম আছে বেলালের। এ গুদামটিই জামানত রেখে তাকে ঋণ দিয়েছিল সোনালী ব্যাংক। ঋণের সে অর্থ আর ব্যাংক ফেরত পায়নি। যদিও এসবি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের গুদামে গত বছর পরিদর্শন চালিয়ে ৫ শতাংশ পাট পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

শুধু এ দুই পাট ব্যবসায়ীই নন, সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া খুলনার ১১৩ পাট ব্যবসায়ীর বেশির ভাগের গুদামের চিত্রই এমন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির খুলনার ছয়টি শাখা থেকে দেয়া ঋণের প্রায় ৯৫ শতাংশই এখন খেলাপি। জামানত হিসেবে ব্যাংকের কাছে গুদামজাত পাট দিয়েছিলেন এসব ঋণখেলাপি। যদিও তাদের গুদামে পর্যাপ্ত পাট খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।

বণিক বার্তার নিজস্ব অনুসন্ধানেও পাট মেলেনি ঋণখেলাপি পাট ব্যবসায়ীদের গুদামে। গত ২৯ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত খুলনার ঋণখেলাপি পাট ব্যবসায়ীদের গুদামে সরেজমিন এ অনুসন্ধান চালানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খুলনাকে ঘিরে পাট বাণিজ্যের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের। নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেও টিকে ছিলেন এখানকার ভালো পাট ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে পরবর্তী সময়ে খুলনার পাট ব্যবসায় ছন্দপতন হয়েছে। প্রভাবশালী মহলের তদবির ও চাপের কারণে ২০০৮-১৬ সাল পর্যন্ত ভুঁইফোড় অনেক ব্যবসায়ীকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের ঢালাওভাবে ঋণ দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সোনালী ব্যাংক। ঋণ নেয়ার পর বেশির ভাগ গ্রাহকই পরে ব্যাংকের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেননি। যে ১১৩ পাট ব্যবসায়ীকে ঋণ দেয়া হয়েছিল, তাদের ১০৮ জনের ঋণই এখন খেলাপি। খুলনায় সোনালী ব্যাংকের ছয়টি শাখা থেকে দেয়া হয় প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে খুলনার করপোরেট শাখা, দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা ও স্যার ইকবাল রোড শাখার বিতরণকৃত ঋণের প্রায় শতভাগই খেলাপি।

সিসি প্লেজ, সিসি হাইপো, পিসিসি ও ব্লক হিসাবের বিপরীতে কাঁচা পাট রফতানিতে এ ঋণ সুবিধা দেয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে সিসি প্লেজ হিসাবের বিপরীতে। গুদামে মজুদ থাকা পাট জামানত রেখে প্লেজ ঋণ দেয়া হয়। ব্যাংক ঋণের টাকা ফেরত না পেলেও গুদামের পাট বিক্রি করে দিয়েছেন ঋণখেলাপিরা। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্কারী ব্যবসায়ীদেরই আবারো নতুন করে ঋণ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সোনালী ব্যাংক।

খুলনার দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা থেকে ২০ জন গ্রাহক ঋণ নিয়েছেন ৩২২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩১৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বা ৯৮ দশমিক ৮৮ শতাংশই এখন খেলাপি। এসব ঋণখেলাপির পাটের গুদামে পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিদর্শনের ভিত্তিতে তৈরি করা বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনা কার্যালয়ের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সোনালী ব্যাংকের দৌলতপুর কলেজ রোড শাখা থেকে ঋণ নেয়া কোনো ব্যবসায়ীর গুদামেই শতভাগ পাট নেই। পাটগুদামের অস্তিত্ব নেই, এমন গুদামও পেয়েছে পরিদর্শক দল।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সোনালী ব্যাংক খুলনার দৌলতপুর শাখার গ্রাহক মেসার্স আজাদ ব্রাদার্সের গুদামে পাট আছে ২ শতাংশ। মেসার্স অনিক জুট ইন্টারন্যাশনালে ২-৩ শতাংশ, মেসার্স এফএম জুট সাপ্লাইয়ে ৫, মেসার্স অগ্রণী পাট সংস্থায় ৫, মেসার্স প্রান্তিক জুট ফাইবার্সে ৫-১০, আলীফ জুট ট্রেডিংয়ে ৫-১০ ও মেসার্স হাফিজ অ্যান্ড ব্রাদার্সে ১০ শতাংশ পাট রয়েছে। ১০-১৫ শতাংশ পাট পাওয়া গেছে মেসার্স সানরাইজ ইন্টারন্যাশনালে। একইভাবে বিএম জুট গার্ডেনে ১৫-২০ শতাংশ, মেসার্স আবীর জুট ট্রেডিংয়ে ১৫, মেসার্স মনোয়ারা জুট ফাইবার্সে ৬৫, মেসার্স কোয়ালিটি জুট সাপ্লায়ার্সে ২০, মেসার্স রিফা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালে ২০-২৫, মেসার্স আলহামদুলিল্লাহ জুট ট্রেডিংয়ে ২০, মেসার্স সিরাজুল ইসলামে ২৫ ও মেসার্স এমডি শরীফ মোল্যায় ১৫-২০ শতাংশ পাট পেয়েছে পরিদর্শক দল। পরিদর্শক দল সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পাট পেয়েছে এসআর জুট ট্রেডিংয়ে।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল ঋণখেলাপি মেসার্স খালিদ জুট ট্রেডিংয়ের কোনো গুদামের অস্তিত্বই খুঁজে পায়নি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্লেজ ঋণের বিপরীতে কোনো গুদামের অস্তিত্ব নেই। যদিও ২০১৭ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে বকেয়া ঋণ ছিল ৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

সোনালী ব্যাংকের খুলনার খালিশপুর শাখা থেকে ১৩ পাট ব্যবসায়ীকে ঋণ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১২ পাট ব্যবসায়ীই বর্তমানে খেলাপি। ঋণখেলাপিদের পাটের গুদামে গত বছর পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিদর্শনকালে কেবল জেমস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গুদামে ৫০ শতাংশ পাট পেয়েছে পরিদর্শক দল। অন্য গ্রাহকদের মধ্যে মেসার্স মক্কা জুট ট্রেডিংয়ে ৪ শতাংশ, আমীর জুট ট্রেডার্সে ৪, পদ্মা এন্টারপ্রাইজে ৫, বিসমিল্লাহ জুট ট্রেডিংয়ে ৫, এসবি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালে ৫ ও মদিনা জুট ট্রেডিংয়ে ৮ শতাংশ পাট পাওয়া গেছে। মেসার্স আরেফিন ট্রেডার্সে ১০ শতাংশ, সীমা ট্রেডার্সে ১৭, মেসার্স পাপেন জুট ট্রেডিংয়ে ২০, মেসার্স বাবুল জুট ট্রেডিংয়ে ২৫ ও মেসার্স এআর জুট ট্রেডিংয়ে ৪৫ শতাংশ পাট খুঁজে পেয়েছে পরিদর্শক দল।

সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, খুলনার ঋণখেলাপি সব পাট ব্যবসায়ীরই গুদামের পরিস্থিতি একই। ব্যবসায়ীরা ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়ার জন্য রফতানি করতে না পারাকে দায়ী করছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। রফতানি করতে না পারলে ঋণখেলাপিদের গুদামে পাট থাকার কথা। কিন্তু কোনো ঋণখেলাপির গুদামেই কাঙ্ক্ষিত মানের পাট নেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান ও দৌলতপুর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী বলেন, খুলনার পাট ব্যবসায়ীরা ২০০ বছর ধরে কাঁচা পাট রফতানি করে আসছেন। ১৯৮৪ সালে হঠাৎ করেই কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ২০১০ ও ২০১৫ সালে সাত মাস কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধের কারণে ২০১৪ সালে পাট রফতানি করা সম্ভব হয়নি। এসব কারণে এ খাতের সব ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

রফতানি করতে না পারলে গুদামের পাট গেল কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে শেখ সৈয়দ আলী বলেন, পাট ব্যবসায়ীরা সব মিলিয়ে ব্যাংক থেকে এক-দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। অথচ দেশের অনেক ব্যবসায়ী একাই ৫-১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন। আমাদের ব্যবসায়ীরা ব্যাংককে হাজার কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করছেন। সোনালি আঁশ পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে।

এদিকে পাট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খেলাপি হয়ে যাওয়া প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আদায় না করেই নতুন করে আরো হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ার আয়োজন চলছে। এর অংশ হিসেবে সাত খেলাপিকে ৭১ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার অনুমোদন এরই মধ্যে হয়ে গেছে। যদিও তাদের কাছে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৩১ কোটি টাকা।

নতুন ঋণ দেয়ার বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল্ মাসুদ বলেন, ঋণখেলাপিদের গুদামে পর্যাপ্ত পাট নেই। তার পরও নানা ছাড় দিয়ে নতুন করে ঋণ দিতে হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে এটি করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের কিছু করার নেই।

যদিও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, সোনালি আঁশ পাট শিল্পকে রক্ষা করতে সরকার একটি নীতিমালা করে দিয়েছে। নীতিমালা অনুসরণ করে কোন ব্যবসায়ী ঋণ পাবেন, কে পাবেন না, সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নির্ধারণ করবে। কোনো ঋণখেলাপির গুদামে পাট না থাকলে কী করতে হবে, সেটি নীতিমালায় উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো বিশেষ সুপারিশ নেই।

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close