আলোচিতজাতীয়

‘হাঁটেন, হাঁটতে থাকেন, রাস্তা বন্ধ, রাষ্ট্রের মেরামতের কাজ চলছে’

আলোচিত বার্তা : ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নানা রকম স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন ব্যবহার করছে৷ সেখানে তাদের কথাগুলো বলছে। সামাজিক গণমাধ্যমেও ওদের অনেকগুলো স্লোগান বা বক্তব্য ভাইরাল হয়ে গেছে।

প্রিয়ন্তিকা মাত্রই লিখতে পড়তে শিখছে। তাঁর মনে অনেক প্রশ্ন। মা লাবণ্যের কাজের চাপ থাকায় প্রিয়কে ব্যস্ত রাখতে একটি বড় কাগজে অনেক কিছু লিখে এরপর একে কেটে কুটে ওলটপালট করে পাজলের মতো করে তার সামনে দিলেন।বললেন, ‘‘শব্দগুলো মিলাও তো দেখি সোনা।” হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিছুটা সময় তো মেয়ে ব্যস্ত থাকবে। মনোযোগী হলেন কাজে। কিন্তু কিসের কী? একটু পরই কাগজ মিলিয়ে হাজির হলো মেয়ে। ওমা! ও তো খুব সহজেই করে ফেললো। প্রিয়কে আবার আরেকটি টাস্ক দিলেন লাবণ্য। এবার আরেকটু কঠিন।

এবারো একটু পরই মেয়ে সব মিলিয়ে নিয়ে এলো। মা তো খুব আশ্চর্য হলেন। কীভাবে পারছে মেয়ে? নিজের কৌতূহল আটকাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কীভাবে করলে তুমি মা?” প্রিয়ন্তিকা বললো, ‘‘ওমা! এত সহজ। কাগজটির পেছনে একটি ছবি আছে দেখো। ওটা মিলিয়ে নিচ্ছি।”

গল্পটি অনেকেরই পরিচিত। এর সারকথাও জানি আমরা। শিশুরা সৃজনশীল। তারা খুব দ্রুত সমস্যা সমাধানের বিকল্প সহজ সমাধান বের করতে পারে। গত ক’দিন ধরে নিরাপদ সড়কের দাবি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন দেখে এই গল্পটি বারবার মনে পড়েছে।

আন্দোলনকারীদের পক্ষে ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি বক্তব্য হলো, ‘হাঁটেন, হাঁটতে থাকেন। রাস্তা বন্ধ। রাষ্ট্রের মেরামতের কাজ চলছে।’ কী সহজ কথা। কিন্তু কতটা গভীর।

কথাটিতে বাগাড়ম্বর নেই। নেই আবেগের আতিশয্য। এই শিক্ষার্থীদের বয়স কতই হবে। টিনএজ পার হয়নি কেউই। অথচ কত বড় কথা তারা বলে ফেলেছে।

বিখ্যাত ফরাসী দার্শনিক-লেখক ভলতেয়ার তাঁর ১৭৫৯ সালে প্রকাশিত বই কাঁদিদ-এ প্রচলিত বেশকিছু দর্শনকে আক্রমণ করেছিলেন। ‘‘ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন”, কিংবা ‘‘ঈশ্বর অনেককিছুই করেন যার মধ্যে মঙ্গলের কিছু নেই” – এই দুই ধারণার মধ্যে শেষ পর্যন্ত তাঁর দর্শন হলো, এ নিয়ে বিতর্ক বা মারামারি না করে, বরং চলুন যাই, ‘‘মাঠে অনেক কাজ পড়ে আছে।”

উলটো করে ছবি মিলিয়ে দেয়া কাল্পনিক চরিত্র প্রিয়ন্তিকা বা কাঁদিদের দর্শনকেই যেন বাস্তবে রূপ দিচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা। ‘রাষ্ট্রের মেরামত’ করছে তারা। যখন বড়রা সবকিছু নিয়ে এ ওকে দোষারোপ করতে ব্যস্ত, লুটে পুটে খেয়ে সিস্টেমকে নামসর্বস্ব করতে ব্যস্ত, তখন এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে সিস্টেম মেরামত করছে। মাঠে কেমন করে কাজ করা উচিত তা দেখিয়ে দিচ্ছে৷ ঘুনে ধরা সিস্টেমকে কীভাবে ‘টাইট’ দিয়ে সোজা বানানো যায়, তা করে দেখাচ্ছে।

আর ভালো কাজ করলে কীভাবে জনসমর্থন পাওয়া যায়, তা প্রমাণ করেছে৷ এ থেকে আমাদের নীতিনির্ধারকগণ কি কিছু শিখবেন? রাষ্ট্রের মেরামতে ক্ষুদে হাতগুলোকে শক্ত করবেন? নাকি পিটিয়ে ভেঙে দেবেন? রাষ্ট্রের মেরামত হলে তো অনেকের উপরি বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রথম আলো পত্রিকায় ‘পরিবহণ খাত মন্ত্রী সাংসদসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের কবজায়’ এই শিরোনামে আজ একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের হাইলাইটস হলো,

‘প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে

বিআরটিএ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেয় না

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা বেনামে ব্যবসায় যুক্ত

ক্ষমতার ছায়ায় থাকা চালকেরাও বেপরোয়া

সড়কে অকাতরে প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের’

(প্রথম আলো ০২.০৮.২০১৮)

প্রিয়ন্তিকার মা যে পাজলগুলো দিয়েছিলেন তা আসলে এগুলোই৷ যুগের পর যুগ ধরে তৈরি হওয়া একটা অরাজকতার মহীরূহে পরিণত হওয়া সিস্টেমকে স্বাভাবিক করাই এর লক্ষ্য।

এই চিত্র নতুন কিছু নয়। এ সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানেন। ক্ষমতার পালাবদলে এসব সংগঠনের নেতৃত্বও বদলায়, কখনো কখনো ব্যবসার মালিকানাও। যুক্ত হয় নতুন মালিকানা। কিন্তু সিস্টেম বদলায় না।

মুনাফাভোগীরা সিদ্ধহস্ত৷ তারা জানেন কীভাবে সিস্টেমকে জিম্মি করা যায়৷ কীভাবে জনদুর্ভোগ তৈরি করে ফায়দা লোটা যায়৷ বারবারই তাই করেছেন। এবারো যানবাহনের নিরাপত্তা নেই এমন অজুহাতে রাস্তায় গাড়ি বন্ধ করে অপকৌশল নিয়েছেন। কিন্তু তারুণ্যের বাধভাঙ্গা প্রতিরোধ ও মানুষের সীমাহীন সমর্থন এই আন্দোলনকে একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছে।

তবে এর আগেও আমরা দেখেছি, কীভাবে বড় বড় আন্দোলনকে নানাভাবে ট্যাগ দিয়ে দুর্বল করে দেয়া হয়। প্রপাগাণ্ডার এই যুগে এই কাজটি খুব সহজ৷ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষকে, তাদের আন্দোলনকে, কী সুচারুরূপে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে ধর্মের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকে ধর্মের বিপক্ষে দাঁড় করানোর অপশক্তি তো সরব আছেই দেশে।

আমরা দেখেছি, ‘কোটা সংস্কারের’ আন্দোলনকেও ‘কোটা বিরোধী’ বানিয়ে ফেলতে। এই আন্দোলনের মূলে না গিয়ে বরং একে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আখ্যা দিয়ে একটি সাধারণীকরণ করার চেষ্টাও দেখেছি খোদ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিত সরকারি দলের কাছ থেকেই।

কিন্তু সড়কে আর প্রাণ ঝরবে না, এই দাবি সবার। এই আন্দোলনকেও নানাভাবে ব্যবহার করা হতে পারে, এমন শঙ্কা করেছেন অনেকেই। কিন্তু এই তরুণরা সতর্ক। তাদের স্লোগান ‘রাষ্ট্রের’ মেরামত করার। কোনো সরকারের নয়। তাদের কোনো নেতা নেই। তারা স্বতঃস্ফূ্র্ত। তারা সবুজ প্রাণ। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অভিভাবকরা। শক্তি যোগাচ্ছেন। সাহস যোগাচ্ছেন।

পাজলের উলটো দিকের ছবিটা মেলাচ্ছেন তারা। আমরা এখনো সেই ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছি। সোজা করে এখনো দেখিনি যে, মূল ধাঁধাটি মিলল কি না। আমরা চাই সেটি মিলুক৷ তা মেলানোর দায়িত্ব আপনাদের, যারা রাষ্ট্র চালান। যদি তা না করেন, তাতে হতাশ হয়ে এই সবুজ তারুণ্য যদি ‘রাষ্ট্রের মেরামত’-এর দ্বিতীয় পর্ব শুরু করে, তাহলে কারো চাকরি থাকবে না।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close