আলোচিতরাজনীতি

হাইব্রিডদের তালিকা প্রণয়ন, বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আওয়ামী লীগ

বার্তাবাহক ডেস্ক : সংগঠনকে মজবুত করতে ও ত্যাগিদের মূল্যায়নে আওয়ামী লীগ আবারও ফের হার্ডলাইনে যাচ্ছে। এজন্য সুবিধাবাদী-প্রতারক-অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটি। টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকায় প্রচুর আগাছা ও সুবিধাবাদী ঢুকে পড়েছে আওয়ামী লীগে। নানা ফাঁকফোকর দিয়ে এরা দলে ঢুকেছে। কিছুদিন পর এদের সুবিধাভোগী চরিত্র প্রকাশ পাওয়ায় দলকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। চরম বিতর্কিত মোহাম্মদ সাহেদের মতো অনুপ্রবেশকারীরাই নানা অপকর্ম করে সরকারকে বদনামের মুখে ফেরে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করছে। এ কারণেই দ্রুত অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে নির্দেশ নিয়েছেন দলটির হাইকমান্ড। শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে হাইব্রিড ও বিতর্কিতরা আওয়ামী লীগে থাকতে পারবেন না।

এ নির্দেশে সারা দেশে দুর্নীতি-অনিয়মসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত ক্ষমতাসীন দলের ৮ হাজার নেতার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। যার মধ্যে ৫ হাজারই বিরোধী মতাদর্শী অনুপ্রবেশকারী। আওয়ামী লীগের বিশ্বস্ত নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই তালিকা প্রনয়ণ করা হয়েছে বলে জানান দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। যাদের ভেতরে এমন অনেকেই আছেন যারা বড় নেতাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও পরিচিত। তবে যত প্রভাবশালী এবং সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন দলের যত ঘনিষ্ঠই হন না কেন, এবার তারা ছাড় পাবেন না। কারো ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নিতে নারাজ সরকার ও দল। এসব বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে এবার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন দলনেত্রী।

দলীয় সূত্র বলছে, হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী আর দলকে ব্যবহার করে যারা অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতা করছেন তাদের চিহ্নিত করা হবে। সাংগঠনিকভাবে এ ধরনের নেতাদের খুঁজে বের করবে আওয়ামী লীগ। দলের কিছু নেতার কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। সম্প্রতি অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, নারীদের নিয়ে অনৈতিক কর্মকা-, জালনোট সরবরাহ, রাজস্ব ফাঁকি, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে যুব মহিলা লীগের নরসিংদী শাখার সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া গ্রেফতার হন। এ অবস্থায় সম্প্রতি গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

২০১৯ সালে ক্যাসিনোকাণ্ডে নাম আসে যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের কয়েকজন নেতার। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় ওমর ফারুক চৌধুরীকে। একই ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীমসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কারও করা হয়। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ ছাড়তে হয় রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে। একই অভিযোগে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাউসার ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথও পদ হারান। অপকর্মকারীদের স্থান আওয়ামী লীগে নেই জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, মাদকবিক্রেতা ও সন্ত্রাসীরা সাবধান। চলছে শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযান। এসব অপরাধীদের স্থান আওয়ামী লীগে নেই। তিনি বলেন, দুঃসময়ের কর্মীদের বাদ দিয়ে পকেট কমিটি করা চলবে না। এখনো সময় আছে পকেট কমিটির লোকরা সাবধান হয়ে যান বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের।

আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, ‘সম্প্রতি কয়েক জন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা একটি বার্তা দলের কর্মীদের কাছে পৌছে দিয়েছেন। আর সেটি হলো, অপকর্মকারীরা দলের লেবাস ব্যবহার করে কোনভাবেই ছাড় পাবে না। তাদের শাস্তি পেতেই হবে। সাংগঠনিক শাস্তি গ্রহণের পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

করোনাকালে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আরো দুটি আলোচিত ঘটনার মধ্যে রয়েছে,করোনার সনদ জালিয়াতিসহ নানা প্রতারণায় জড়িত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম এবং জেকেজির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী ও তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে বিচারের মুখোমুখি করা। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মহাপ্রতারক সাহেদ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপকমিটির সদস্য পরিচয় দিয়ে সরকার ও দলের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেন। এসময় তিনি দলীয় পদ-পদবী ব্যবহার করে অপতৎপরতায় মেতে ওঠেন। অভিযুক্ত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ করিম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ পারভেজের ৫২টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করারও আদেশ দিয়েছে আদালত। এদিকে সংসদ সদস্য শহিদ ইসলাম পাপুল মানব পাচারে অভিযুক্ত হয়ে কুয়েতে গ্রেপ্তারের ঘটনায়ও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পাপুল ও তার স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা ইসলামের অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

একাদশ জাতীয় সংসদে এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল। গত ২৮ জানুয়ারি কুয়েতের ফৌজদারি আদালত পাপুলকে কারাদণ্ডিত করায় তার আসনটি গত ২২ ফেব্রুয়ারি শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়। আসন শূন্য ঘোষণা গেজেট নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হলে গত ৩ মার্চ উপ-নির্বাচনের তফসিল দেয় ইসি। ১১ এপ্রিল ভোটের তারিখ থাকলেও পরবর্তীতে করোনার কারণে পিছিয়ে দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। সে সময়ও শেষ হয়ে আসায় গত ২ জুন ভোটের নতুন তারিখ দেয় কমিশন।

পাপুলের বিরুদ্ধে কুয়েত সরকার মানবপাচার ও অর্থপাচারের অভিযোগ এনে ২০২০ সালের ৭ জুন আটক করেছিল। তারপর বিচারকাজ শেষে দেশটির আদালত ২৮ জানুয়ারি রায় দেন। তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের এমপি। বিতর্কিত এমন আরো অনেকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানকে সর্বমহল থেকে সাধুবাদ জানানো হচ্ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশ জুড়ে ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। ক্যাসিনোকা-ে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ায় তৎকালীন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়। একইভাবে নির্মাণ খাতের ‘গডফাদার’ জি কে শামীমসহ যুবলীগ, কৃষক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের আরো কয়েক জন নেতার ঠাঁই হয়েছে কারাগারে। পদ হারিয়েছেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীসহ অনেকেই। ব্যাংক হিসাব তলব ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ নানা আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। তদ্বির-বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক বনে যাওয়া নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়াকেও জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর একজন সদস্য জানান, দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই দলের নেতাকর্মীদের অপকর্মে জড়িয়ে পড়াকে অপছন্দ করেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তার কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকে না। কিন্তু কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেবেন এরই মধ্যে তিনি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে দলে অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আশ্রয়দাতারা আর বিতর্কিতদের রক্ষা করতে পারবে না। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, বিভিন্ন খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। মুখোশের আড়ালে যতই মুখ লুকিয়ে রাখুন, কোন অপরাধীই অপরাধ করে ছাড় পাবে না, শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তেই হবে। আর অপরাধীদের কোন পরিচয় নেই, দুর্বৃত্তের কোন দল নেই। অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেবির কর্তাব্যক্তিদের গ্রেফতারই প্রমাণ করে অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান। বিতর্কিতরা কেউ আওয়ামী লীগে থাকছেন না বলে জানান।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্য সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি যে ক্রমাগত অবান্তর কথা বলে সাহেদের গ্রেফতারে তা প্রমাণ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কে কোন দল বা মতের সেটি কখনই দেখা হয়নি। যদি আওয়ামী লীগের কেউ হয়, এমনকি পদধারী নেতাও যদি হন, তার বিরুদ্ধেও কিন্তু অতীতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর যদি সাহেদের মদদদাতা ধরতে হয়, তাহলে হাওয়া ভবন থেকে যারা মদদ দিয়েছিল এবং স্কাইপিতে যখন তারেক রহমানের সঙ্গে সে কথা বলেছিল, সে ব্যাপারে বিএনপি কি বলবে? আর অবশ্যই সাহেদের অপকর্মের সঙ্গে যদি অন্য কেউ যুক্ত থাকে, তদন্তে যদি সেটি বেরিয়ে আসে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ব্যাপারে তৃণমূলের বেশ ক’জন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা বলেন, বিএনপি-জামায়াত থেকেও ভয়ঙ্কর নব্য আওয়ামী লীগ। এরা সুযোগসন্ধানী। যাদের কখনও সভা-সমাবেশে দেখিনি তারাও এখন আওয়ামী লীগ করে। দলের দুঃসময়ের ত্যাগী ও আদর্শিক নেতাকর্মীরাও এসব অনুপ্রবেশকারীর দাপটের কাছে অসহায়। তাই এদের চিনে রাখতে হবে।

 

সূত্র: ভোরের পাতা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close