আইন-আদালতআলোচিতরাজনীতি

হেলেনা জাহাঙ্গীর : ‘অপরাধ’ ও মামলার সঙ্গতি-অসঙ্গতি

বার্তাবাহক ডেস্ক : অবশেষে বহুল আলোচিত-সমালোচিত হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কথিত ‘চাকরিজীবী লীগ’ গঠনে সম্পৃক্ততার খবরে তোলপাড়ের পরই গ্রেপ্তার হলেন তিনি।

সিআইপি এবং এফবিসিসিআই -এর পরিচালক, তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সঙ্গে অনেক দিন ধরেই ঘনিষ্ঠ। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে নিজেও বলেছেন, চাকরিজীবী লীগ নিয়ে তিনি তার পরিচিত নেতাদের সাথে কথা বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সাথে তার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি খবরেও এসেছে।

হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে। তার আগে রাত ৯টা থেকে গুলশান ২-এর বহুতল ভবনটিতে তল্লাশি চালায় র‌্যাব। ওই ভবনের পাঁচ তলায় তিনি সপরিবারে থাকেন।

তার বাসা থেকে হরিণের চামড়া, বিদেশি মদ, ক্যাসিনো সামগ্রী, বিদেশি মূদ্রা এবং বেশ কিছু ছুরি ও চাকু উদ্ধার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব জানায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন, মাদক, অর্থ পাচার আইনে মামলা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধেরও প্রমাণ মিলেছে। বিভিন্ন সময় তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নান ধরনের কুৎসা ছড়িয়েছেন।

কিন্তু পুলিশের সাবেক এআইজি সৈয়দ বজলুল করিম বলেন, ‘‘এই সব বিষয় নিয়ে মামলা খুব যুক্তিযুক্ত নয়। এই ধরনের মামলা আদালতে প্রমাণ করাও কঠিন। তাই সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা করা প্রয়োজন।’’

তিনি বলেন, ‘‘এরা অনেক অর্থ খরচ করে নেতাদের ঘনিষ্ট হয়ে দলের ভিতর ঢোকে৷ সেটাও তদন্ত করা প্রয়োজন যে কারা তাদের আশ্রয় দেয়। আর এই ধরনের হেলেনা জাহাঙ্গীর একজন নয়। আরো অনেক হেলেনা জাহাঙ্গীর আছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।” তার মতে, এই ধরনের ব্যক্তি ও সংগঠনের ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সারা বছর নজরদারী প্রয়োজন। সেটা করা হলে এরা গজাতে পারবে না, আবার গজিয়ে উঠলেও দ্রুতই আইনের আওতায় আনা যাবে। তবে প্রতারণার মামলার ধারাটিও দুর্বল। তাই এ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা উচিত।’’

এদিকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের মদের লাইসেন্স আছে, হরিণের চামড়াটি উপহার হিসেবে পেয়েছেন, ক্যাসিনো সামগ্রী নিজেরা খেলার জন্য রেখেছেন আর বিদেশি মুদ্রা নানা সময় বিদেশ ভ্রমণের পর থেকে যাওয়া।

হেলেনা জাহাঙ্গীরের অননুমোদিত আইপি টিভি ‘জয়যাত্রা টেলিভিশনের’ মিরপুরের অফিসেও র‌্যাব অভিযান চালিয়েছে। এখান থেকে ‘জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠনও পরিচালনা করা হয়। দুই বছর আগে তথ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া সাংবাদিক হিসেবে হেলেনা জাহাঙ্গীরের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড নিয়েও বিতর্ক উঠেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল তিনি কীভাবে এই কার্ড পান। র‌্যাব জানায়, মিরপুরে পুরো একটি টেলিভিশনের সেটআপ রয়েছে তার। তার বিরুদ্ধে চাকরি দেয়ার নামে অর্থ আদায়েরও অভিযোগ আছে। তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্যও হয়েছিলেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। চাকরিজীবী লীগ নিয়ে বিতর্ক শুরুর পর তাকে সেই দায়িত্ব থেকে সরানো হয়। গত বছর ভুয়া করোনা টেস্টের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. সাহেদ ওরফে রিজেন্ট সাহেদও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ- কমিটির সদস্য ছিলেন। তাকেও তখন বহিস্কার করা হয়।

আওয়ামী লীগের স্বীকৃত সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন ১০টি। এই সংগঠনগুলো গঠনতান্ত্রিকভাবে অনুমোদিত। এর বাইরে আওয়ামী লীগের সহযোগী বা ভ্রাতৃপ্রতীম কোনো সংগঠন নেই। নির্বাচন কমিশনেও এই ১০টি সংগঠনের তালিকা আছে। বার বার বিবৃতি দিয়েও বলা হয়েছে বলে জানান আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘‘যারা আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে এসব করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। কারণ, নাগরিকদের সংগঠন করার অধিকার আছে। কিন্তু কেউ যদি আওয়ামী লীগ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের কিছু করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। আমাদের নজরে এলেও আমরা তাদের জানাই।’’

এদিকে র‌্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইং-এর প্রধান কমান্ডার খন্দকার আল মঈন শুক্রবার বিকেল ৪টার পর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘‘হেলেনা জাহাঙ্গীর তার জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের নামে দেশ ও বিদেশ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ব্যক্তিতগত কাজে ব্যবহার করতো। ফেসবুকে সমালোচিত সেফুদার সাথে তার যোগাযোগ আছে। সেফুদা তাকে নাতি বলে ডাকে। সে বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তির সাথে কৌশলে ছবি তুলে তা নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছে, যা ওইসব ব্যাক্তির সম্মান হানি ঘটিয়েছে। তার বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধেরও প্রমাণ মিলছে।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘তার সঙ্গে আরো যারা জড়িত আদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া আরো যারা এই ধরনের তৎপরতায় জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘বিটিআরসি এই অভিযানে সহায়তা করেছে। তল্লাশি করে যা পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতেই মামলা হয়েছে। তদন্তে আরো যা পাওয়া যাবে তা-ও আইনের আওতায় আসবে।’’

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close