আলোচিতস্বাস্থ্য

গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই করোনার টিকা নেওয়া উচিত: সিডিসি

বার্তাবাহক ডেস্ক : রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে গত ২২ জুলাই মারা যান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের নবম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. জারিন তাসনিম রিমি। ডা. জারিন তিন দিনের জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তারপর তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। তিনি নয়মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, প্রতিদিন প্রেগনেন্ট চিকিৎসক মায়ের মৃত্যুর খবর শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন। কয়েকদিন আগে ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজের ডা. হালিমা মারা গেলেন।

চার মাসের গর্ভবতী সাংবাদিক শেখ সীরাজুম মুনীরা নীরা কেন গর্ভবতী নারীদের করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হচ্ছে না, সে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, টিকা না দেওয়ার কারনে গর্ভবতী নারীদের মৃত্যুর হার বেশি বলেই দেখা যাচ্ছে। তারা এমনিতেই অনেক বেশি ভালনারেবল নানা কারনেই। টিকা নিলে শঙ্কাটা কম থাকে।

ইংল্যাণ্ড-আমেরিকাতে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক দেশের জন্য আলাদা নির্দেশনা দিয়েছে, সেই টিকাগুলোতে আমাদের দেশেও এসেছে। তাহলে আমরা কেন পাব না, প্রশ্ন করেন তিনি।

পেশায় সাংবাদিক সীরাজুম মুনীরা বলেন, সাংবাদিকসহ অনেক পেশার গর্ভবতীদের কাজের জন্য বাড়ির বাইরে যেতে হয়। ফলে তাদের এক্সপোজার বেশি হয়। এজন্য টিকার সুরক্ষা প্রয়োজন বেশি।

দেশে গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। তখন থেকেই স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় বলে এসেছে, যারা টিকার আওতার বাইরে থাকবে তাদের মধ্যে গর্ভবতী নারী অন্যতম। কারন গর্ভবতী নারীদের নিয়ে বিশ্বে কোনও ট্রায়াল হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তখন জানিয়েছিল বছরে ৩৫ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন, তারা অবশ্যই করোনা টিকার বাইরে থাকবেন।

সরকার দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধী টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা করেছে। বাকি ২০ শতাংশকে হার্ড ইমিউনিটির (গণরোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কারণে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়ে গর্ভবতী অনেক নারীর মৃত্যু হয়েছে-যা আশঙ্কাজনক।

সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলেছে, গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই টিকা নেওয়া উচিত। এতে করোনা ঝুঁকি কমবে। গর্ভাবস্থায় অন্য কোনও সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে টিকা নিতে পারে। এতে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে এবং মা ও শিশু নিরাপদ থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে গর্ভবতী নারীদের টিকা কর্মসূচির আওতার বাইরে রাখায় ঘটছে মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা।

গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে অবসট্রাক্টিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)।

সারা দুনিয়াতেই এখন গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ওজিএসবির সাবেক সভাপতি ও মামস ইন্সটিটিউট অব ফিস্টুলা অ্যান্ড উইমেন্স হেলথ এর প্রধান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার বলেন, প্রথম তিন মাস বা ১২ সপ্তাহ আমরা নিষেধ করছি। কারণ, সে সময়ে বাচ্চার অর্গানগুলো ডেভেলপ করে, তাই এ সময়ে না দিয়ে ১২ সপ্তাহ পর থেকে গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়া উচিত এবং বাংলাদেশে যে গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়া হচ্ছে সে ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা উচিত।

অবসট্রাক্টিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) এর সাবেক সভাপতি ও ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার লিমিটেড (আইসিআরসি)এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সামীনা চৌধুরী বলেন, গর্ভবতী নারীদের অবশ্যই টিকার আওতায় আনা উচিত।

সারা দুনিয়ায় দেওয়া হচ্ছে, আমাদেরও বসে থাকলে হবে না। বিশ্বের অনেক দেশেই গর্ভকালীন সময়ে টিকা দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশেও এটা দেওয়া উচিত।

অতি সম্প্রতি গর্ভবতী অনেক নারীর মৃত্যু হচ্ছে এবং পেটের শিশুও মারা যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মায়ের যদি অক্সিজেন ঘাটতি হয় তাহলে সন্তান পেটের ভেতরে মারা যায়।

রাজধানীর করোনা ডেডিকেটেড একটি হাসপাতালের কথা জানিয়ে ডা. সামীনা চৌধুরী বলেন, ‘সেখানকার চিকিৎসকরা বলছেন, ‘গর্ভবতী নারীদের বাঁচাতেই পারছি না’

একমাত্র টিকাই তাদেরকে বাঁচাতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, আর কোনও পথ খোলা নেই আমাদের সামনে।

‘ এতে রিস্ক-বেনিফিট দুটোই রয়েছে, কিন্তু এখানে রিস্ক কম, বেনিফিটই বেশি’ জানিয়ে তিনি বলেন, অধ্যাপক সামীনা চৌধুরী বলেন, টিকা দিলে অ্যাবরশন হবে কিনা-সে নিয়ে একটা সংশয় রয়েছে। কিন্তু সাধারণ সময়ে যে অ্যাবরশন হয়। টিকা দিলেও সেই একই হবে। এটি একদম প্রমাণিত।

তিনি আরও বলেন, অনেক জায়গায় ট্রায়াল হয়েছে, টিকা দিলে মা এবং সন্তানের বেনিফিট হয়। মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে-এমন অবস্থায় টিকাতো আগে থেকেই দেওয়া হচ্ছে। আর বেনিফিট এজন্য যে, মায়ের শরীরে যে ইমিউনিটি তৈরি হয় সেটা বুকের দুধ খাওয়া সন্তানের শরীরে গেলে সন্তানের উপকার হয়। তার মধ্যে রেজিস্ট্যান্স গ্রো করে মন্তব্য করে অধ্যাপক সামীনা চৌধুরী বলেন, এখন আর অপেক্ষা করার কোনও মানেই হয় না। ইতোমধ্যেই ওজিএসবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গর্ভবতী নারী এবং বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন মায়েদের টিকার আওতায় আনতে হবে।

গর্ভধারণের যে কোনও স্টেজে টিকা দেওয়া যাবে এবং দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার লিমিটেড (আইসিআরসি) র চিফ কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম।

তিনি বলেন, গর্ভবতী নারীদের মৃত্যুহার এবারে অনেক বেশি।

ওজিএসবির পক্ষ থেকে আমরা সুপারিশ করেছি গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রাজেনেকা-সিনোভ্যাক সব টিকাই নেওয়া যাবে, অ্যালাউড।

পৃথিবীর সব সংস্থা গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছে, তাহলে আমরা কেন দেব না- বলে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, আমরা ২৫ জুলাই একটি প্রস্তাব দিয়েছি নাইট্যাগকে (ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ)। তারা যদি অ্যাপ্রুভ করে তাহলে আমরা দেব।

তিনি আরও বলেন, গর্ভবতী নারীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে অনেক দেশ তাদের নিজেদের প্রটোকলে দিয়েছে। যে কোনও দেশে তাদের নিজের প্রয়োজনে এটা করতেই পারে।

ওজিএসবির প্রস্তাবনা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি। কেউ যদি টিকা নিতে চায়, ন্যাশনাল কমিটি যদি আমাদের অ্যাপ্রুভ করে তাহলে আমরা দেব।

 

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close