আলোচিত

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ছিল অসাধু ব্যক্তিদের টাকার খনি

আলোচিত বার্তা : টাঙ্গাইলের বাসাইলের গোপাল চন্দ্র সাহা বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানিতে নিয়োগ পান ১৯৯৯ সালে, সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে। ঠিকাদারদের কয়লা পাইয়ে দিতে কাজে লাগান অধস্তন কর্মকর্তাদের। স্থানীয় ঠিকাদারদের কাছে হয়ে ওঠেন আস্থার পাত্র। আসতে থাকে অঢেল টাকা। শেয়ারবাজারেই বিনিয়োগ করেছেন কোটি টাকা। ব্যবসার পরিসর বাড়িয়েছেন ফুলবাড়ী ও রংপুর এলাকায়। আলু ব্যবসায় গত বছর বিনিয়োগ করেন কোটি টাকার উপরে। ব্যবসায়িক অংশীদারি রয়েছে কয়লার ঠিকাদার আমিন ট্রেডার্সের মালিক রুহুল আমিনের সঙ্গেও। রুহুল আমিনের নামে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে আলু রাখেন তিনি।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে টাকার খনি বানিয়ে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন অন্য অসাধু ব্যক্তিরাও। বহুতল ভবনের মালিক বনে গেছেন খনির গাড়িচালকও।

সরেজমিন ঘুরে এবং খনি কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি ঠিকাদারদের কাছে কয়লা বিক্রির যে চক্র গড়ে উঠেছিল, তার মূলে ছিলেন দুজন কর্মকর্তা। কয়লা বিক্রির বিভিন্ন প্রক্রিয়া তারাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরে ওই টাকা বণ্টন হতো এমডি থেকে শুরু করে অন্য অসাধু কর্মকর্তাদের মধ্যেও।

এ দুই কর্মকর্তার অন্যতম গোপাল চন্দ্র সাহা গত বছরের মতো আলু ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন এবারো। তবে এবার আর ফুলবাড়ীতে নয়, রংপুর ভিআইপি কোল্ড স্টোরেজে আলু রেখেছেন তিনি। জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। কয়লা খনি থেকে টাঙ্গাইল ও ঢাকায় যাতায়াতে সড়ক বা রেলপথ ব্যবহার করেন খুব কমই। আকাশপথ ছাড়া তিনি ঢাকায় যাতায়াত করেন না।

বড়পুকুরিয়া কয়লা দুর্নীতিতে যে ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তার অন্যতম আসামি গোপাল চন্দ্র সাহা। গতকাল তার সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বণিক বার্তাকে বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। খনির কয়লা বাণিজ্যের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। খনি কর্তৃপক্ষ যে মামলা করেছে, তাতে পদ অনুযায়ী আমিও আসামি। আমার বিরুদ্ধে যদি উদ্দেশ্যমূলক মামলা না হতো, তাহলে কেন আমাকে ১৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে? যদি আমি জড়িতই থাকতাম, কেন উপব্যবস্থাপকদের নামের পরে আমার নাম? পদ অনুযায়ী আমাকে উপরের দিকের আসামি করার কথা ছিল না কি?

বহুতল ভবনের মালিক খনির গাড়িচালকরা: কয়েক বছর আগেও কয়লাবোঝাই ট্রাক চালাতেন আব্দুল ওয়াহেদ। কয়লা বাণিজ্যে ভাগ্য খুলেছে তারও। ফুলবাড়ী থানার নিমতলায় এখন ১১ শতক জমির পাঁচতলা ফাউন্ডেশনের বাড়ি তার। বর্তমানে ফুলবাড়ীতে প্রতি শতক জমির দাম ৭-৮ লাখ টাকা।

তারই সমসাময়িক গাড়িচালক শাহা গ্রামের রবিউল ইসলাম। এখনো দিনমজুরই রয়ে গেছেন তিনি। রবিউল জানান, খনিতে গাড়ি চালানোর চাকরি পাওয়ার পর ধীরে ধীরে কয়লা ডিও পেপার বাণিজ্য শুরু করেন ওয়াহেদ। সেই টাকায় আজ তিনি কোটিপতি।

খনির গাড়ি চালিয়ে কোটিপতি হয়েছেন এমন আরেকজন শাহীন আলম। একসময় ফুলবাড়ীতে গাড়ি চালাতেন তিনি। যদিও এখন সুজাপুরে বহুতল ভবনের মালিক হয়েছেন শাহীন।

মূল রূপকার প্রধানীয়া: বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে সংকট সৃষ্টির দায়ে প্রাথমিকভাবে যে চার কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদের একজন মো. আবুল কাশেম প্রধানীয়া। গত বুধবার কয়লা খনি কোম্পানির পক্ষ থেকে যে মামলা হয়েছে, সেখানেও চার নম্বর আসামি তিনি।

তবে এ দুই অসাধু কর্মকর্তার কয়লা বাণিজ্যকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত হন আব্দুল আজিজ খান, কামরুজ্জামান, এমএমএন আওরঙ্গজেব ও প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন। সাবেক এ চার এমডির বিরুদ্ধে কয়লা বিক্রি ও নিয়োগ বাণিজ্য থেকে সরাসরি কমিশন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০০ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানিতে নিয়োগ পান আবুল কাশেম প্রধানীয়া। নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার দুর্নীতি ও অনিয়ম। কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না কিনেও ক্রয় দেখিয়ে কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এরপর তার এ অনিয়ম সীমা ছাড়াতে থাকে। কালোবাজারে কয়লা ও খনির যন্ত্রপাতি বিক্রি, নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্যসহ সব অনিয়মের কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। অনিয়মের সীমা এতটাই বিস্তৃত হয় যে, কালোবাজারে কয়লা বিক্রি করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কয়লা মজুদের ইয়ার্ড খালি করে দেন। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাখা ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লাও বেসরকারি ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি হয় তার নেতৃত্বে। অবৈধ কয়লা বাণিজ্যের টাকায় নারায়ণগঞ্জে গড়ে তুলেছেন বহুতল ভবন। গুলশানে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমি।

খনির কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর কয়লা বিক্রির জন্য যে ডিও পেপার চাওয়া হতো, সাধারণ ইটভাটার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিটি ডিও অনুমোদন দেয়ার নামে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন প্রধানীয়া। পরে ওই টাকা কোম্পানির এমডিসহ বাণিজ্য চক্রের মতো বণ্টন হতো। অনিয়মের দায়ে বিভিন্ন সময় খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বদলি করা হলেও অস্পৃশ্য থাকেন প্রধানীয়া। কয়লা বাণিজ্যের বাইরে নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য থেকেও বিপুল অংক উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির অর্থ আত্মসাতেরও।

যদিও সব অভিযোগ অস্বীকার করেন সদ্য অপসারিত ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানিতে মহাব্যবস্থাপক হিসেবে বদলি হওয়া আবুল কাশেম প্রধানীয়া। তিনি বলেন, কোনো কিছুতে আমার সংশ্লিষ্টতা নেই। সিবিএ নেতাদের আধিপত্য কমানোসহ কোম্পানির কিছু কাজে সংস্কার আনার চেষ্টা করায় আমার বিরুদ্ধে এসব ষড়যন্ত্র হচ্ছে।

কয়লা বাণিজ্যে বিতর্কিত এমডিরা: কয়লা বাণিজ্যে জড়িয়ে যেসব ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিতর্কিত হয়েছেন তাদের অন্যতম সদ্য অপসারিত প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন। এছাড়া বিতর্কিত হয়েছেন, সাবেক এমডি ও বর্তমানে মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিংয়ের ব্যবস্থাপক এমএমএন আওরঙ্গজেব, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) আব্দুল আজিজ খান ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (আরপিজিসিএল) কামরুজ্জামানও। এদের মধ্যে সদ্য অপসারিত প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন কয়লা বিক্রির অর্থের ভাগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী থানা আওয়ামী লীগ নেতা এবং এমপিদের সুপারিশে কয়লা বিক্রির অনুমোদন দিয়েছেন। অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে।

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close