আলোচিতগাজীপুরসারাদেশ

অবশেষে একাধিক মামলার আসমি ‘রোহিঙ্গা কাশেম’ বিজিবি’র হাতে গ্রেপ্তার

বিশেষ প্রতিনিধি : সাংবাদিকতার নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত দৈনিক যুগান্তরের গাজীপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কাশেম ওরফে রোহিঙ্গা কাশেম কক্সবাজার জেলার টেকনাফ এলাকায় বিজিবি’র একটি চেক পোস্টে আটক হয়েছেন।

রোববার (১৮ জুলাই) মধ্যরাতে তাকে টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে বিজিবি।

আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে মাদক কারবারসহ বিভিন্ন অপরাধে কক্সবাজার ও গাজীপুরে একাধিক মামলা রয়েছে। সর্বশেষ গত ২০ জুন গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের হওয়া এক মামলায় তিনি পলাতক ছিলেন। ইতিপূর্বে তাকে গ্রেপ্তারের দাবীতে নির্যাতিত নারীর পক্ষে এলাকাবাসী গাজীপুরের হোতাপাড়ায় মানববন্ধনও করেছেন। রোববার রাতেই তার গ্রেপ্তারের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারেন এলাকাবাসী।

এদিকে তার গ্রেপ্তারের সত্যতা জানতে টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাফিজুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রোববার স্থানীয় একটি চেক পোস্ট থেকে প্রাইভেটকারসহ সন্দেহজনক হিসেবে আবুল কাশেমকে আটক করেন বিজিবি সদস্যরা। এ খবর গাজীপুরে পৌছলে জয়দেবপুর থানা পুলিশের অনুরোধে রোববার মধ্য রাতে তাকে টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়। আবুল কাশেমের প্রাইভেটকারের সামনে ও পেছনে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার স্টিকার লাগানো ছিল। গাড়ীটির নম্বর প্লেটে লেখা রয়েছে ঢাকা-৬৩/ও। আইনী প্রক্রিয়া মতে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হবে জানিয়ে টেকনাফ থানার ওসি আরো বলেন, আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার ১৮(৬)২১ নং মামলার অনুসন্ধানের জন একটি পত্র বেশ ক’দিন আগেই টেকনাফ থানায় পাঠানো হয়েছে।

এব্যাপারে বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের (২-বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্ণেল ফয়সাল হাসান খাঁনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রোববার বিকেলে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের হোয়াইক্যং সড়ক তল্লাশী চৌকিতে একটি প্রাইভেটকার তল্লাশী করতে চাইলে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিজিবি সদস্যদের বাঁধা দেন আবুল কাশেম। এসময় তার গতিবিধি ও আচরণ সন্দেহ হলে তাকে ব্যাটালিয়ন সদরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সে গাজীপুর ও কক্সবাজার জেলায় একাধিক মামলার আসামি এবং সে বর্তমানে গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার একটি নারী নির্যাতন মামলার পলাতক আসামি। জয়দেবপুর থানা পুলিশও বিষয়টি নিশ্চিত করে তাকে স্থানীয় থানায় হস্তান্তরের জন্য বিজিবিকে অনুরোধ জানায়। পরে তাকে টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়।

জানা গেছে, আবুল কাশেম গাজীপুরে রুহিঙ্গা কাশেম নামে পরিচিত। তিনি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঝিমংখালী গ্রামের আবু শামার ছেলে। কক্সবাজারে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি সেখানে পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে কয়েক বছর আগে গাজীপুর সদরের হোতাপাড়ায় এসে গোপনে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। কক্সবাজারে তিনি দুটি বিবাহ করেন। আগের সংসারে তার সন্তানও রয়েছে। কিন্তু এসব তথ্য গোপন রেখে তিনি গাজীপুরের হোতাপাড়ায় স্থানীয় এক মেয়েকে প্রেম করে বিয়ে করেন এবং পরবর্তীতে এখানে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন। একপর্যায়ে গাজীপুরেও তিনি বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ইতিপূর্বে গাজীপুরে গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খাটেন। পরবর্তীতে অপরাধ জগত থেকে নিজেকে আড়াল করতে অনলাইন ও আন্ডরগ্রাউন্ড পত্রিকার সাংবাদিকতার কার্ড সংগ্রহ করেন। গড়ে তুলেন হোতাপাড়া প্রেসক্লাব। একপর্যায়ে গত বছর দৈনিক যুগান্তরের জয়দেবপুর প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। অথচ কক্সবাজারের এক মামলার জবানবন্দীতে তিনি স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন বলে স্বীকার করেন।

এদিকে গাজীপুরের একাধিক পেশাদার সাংবাদিক জানান, আবুল কাশেম গত বছর দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় জয়দেবপুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের আগে সাংবাদিক হিসেবে তার পরিচিতি ছিল না। যুগান্তরে জয়দেবপুর প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেই তিনি অসৎ উরদ্দশ্যে বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। পরে গত বছর ২ ডিসেম্বর বন বিভাগের এক মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে অত্যন্ত সুকৌশলে ওই কর্পোরেট মিডিয়া হাউজে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেন এবং দৈনিক যুগান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক (স্টাফ রিপোর্টার) হিসেবে নিয়োগলাভ করেন। এর পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি দামী গাড়ী কিনেন। প্রায়ই বিমানে উড়ে অথবা নিজস্ব গাড়ী হাকিয়ে টেকনাফ চলে যেতেন। গাড়ীতে সাংবাদিকতার স্টিকার লাগিয়ে তিনি মাদক বহন করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি গাজীপুর জেলা ও কক্সবাজারে মোটা অংকের বিনিময়ে তার অনুগত বেশ কয়েকজন নতুন প্রতিনিধি দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভিতে নিয়োগ দেন। এর আগে যুগান্তর ও যমুনা টিভির পুরনো বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিকে নানা ষড়যন্ত্র করে চাকরিচ্যুত করেন। তার ষড়যন্ত্রের ফলে গাজীপুর ও কক্সবাজার জেলায় কর্মরত যুগান্তর ও যমুনা টিভির প্রতিনিধিরা চাকরিচ্যুত হন এবং ওই কর্পোরেট হাউজের কর্তা ব্যক্তিদের নাম বিক্রি করে মোটা অংকের বিনিময়ে নতুন প্রতিনিধি নিয়োগ দেন। এছাড়াও নতুন-পুরনো সব প্রতিনিধি তার চাঁদাবাজির আতঙ্কে থাকতেন। বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিনিধিদের কাছে টাকা দাবী করতেন। গাজীপুর মহানগরের ৮টি থানার মধ্যে ৫টি থানায় তিনি টাকার বিনিময়ে যুগান্তর প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়েছেন এবং যুগান্তর ও যমুনা টিভির প্রতিনিধি বা সাংবাদিক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে আরো অনেকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সাংবাদিকরা আরো জানান, আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে কক্সবাজার থানায় এফআইআর নং- ৪৯, তারিখ ২৫-০১-২০১১, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলা নং- ৬৭, তারিখ ২৯-০৪-২০০৯, মাদক মামলা নং-২৬, তারিখ ২০-০৫-২০১৫।

এছাড়া গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নং ১৮, তারিখ ২০-০৬-২০২১, সিআর মামলা নং-৮১৩/২০১৭, ধারা- তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর ৫৭/২ তৎসহ পন্যগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের ২০১২ এর ৮ ধারা। তিতাস গ্যাস মামলা নং- ৪০, তারিখ ১১-০৫-২০১৪, ধারা বাংলাদেশ গ্যাস আইন ২০১০ এর ১২/১ নং ধারা। সিআর মামলা নং- ৮১/২০১৭, চাঁদাবাজি মামলা নং-৩৮৫/৫০০ দন্ডবিধি মামলা। চাঁদাবাজির অভিযোগে সিআর মামলা নং-৮১২/১৭ (গাজীপুর কোর্ট), সিআর মাামলা তথ্য প্রযুক্তি ৮১৩/১৭, গাজীপুর কোর্ট ১৯০/১৭, রাজেন্দ্রপুর পূর্ব বিট মামলা (বন) সিআর নং- ৮৪/২০১০, ধারা ২৬(১) ক মামলার বিচারকার্য চলমান, হাইকোর্ট থেকে জামিনপ্রাপ্ত।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close