আলোচিতজাতীয়সারাদেশ

দুদকের নতুন তালিকায় শতাধিক ভিআইপি: এক মাসের মধ্যে ফাইল নিষ্পত্তি

বার্তাবাহক ডেস্ক : দীর্ঘদিনেও অনুসন্ধান, তদন্ত নিষ্পত্তি হয়নি এমন শতাধিক ভিআইপির নামে নতুন তালিকা করেছে দুদক। অবৈধ সম্পদ, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারে জড়িতদের এ তালিকায় আনা হয়েছে।

সংস্থাটি এদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের ফাইলগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির পর নতুন নথি চালু করতে চায়। এছাড়া আগের তালিকাভুক্তদের নথিও দ্রুত নিষ্পত্তি করতে চাচ্ছে দুদক। এজন্য সংস্থাটির বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখার মহাপরিচালক, পরিচালক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

দুদক সূত্র জানায়, গত মার্চে বর্তমান কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান ও একজন কমিশনার নিয়োগ পান। এরপর তিন কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন দফায় দফায় বৈঠকে বসেন। কমিশন সভা ছাড়া মহাপরিচালক থেকে উপপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে পৃথক বৈঠক হয়। এতে ভিআইপিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত ছাড়াও অন্যদের যেসব ফাইল চলমান তা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়। দুদকের প্রধান কার্যালয় ছাড়াও বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালকদের কাছেও একই বার্তা দেওয়া হয়েছে ।

নতুন তালিকায় রাজনীতিবিদদের মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন, বিএনপি নেতা শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা উত্তরের সিটি করপোরেশনের বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও গোল্ডেন মনিরসহ এক ডজন নেতার নাম আছে। এদের নাম অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দেশের বাইরে অর্থ পাচারের অভিযোগে অনুসন্ধান শেষ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে চায় দুদক।

এছাড়া আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাফিয়া শাহেদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. ইকবালসহ তিন পরিচালক ও অপর ৭০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নারী নেত্রী পাপিয়া ও শাহেদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান ও তদন্ত রিপোর্ট তৈরির কাজ চলছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক আশরাফুল আলম, কার্গো বিভাগের জিএম আরিফ উল্লাহ, সাবেক জিএম আলী আহসান, শামসুল করিমসহ শীর্ষ পর্যায়ে ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিমানের কার্গো শাখা থেকে ১১৮ কোটি টাকা লোপাটের একটি অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিমানের সাবেক এমডি আবদুল মুনীম মুসাদ্দিক আহমেদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চলছে। তার বিদেশ গমনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এদিকে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ছাড়াও সিভিল এভিয়েশন, রাজউক, সড়ক ও জনপথ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের ৩৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে দুদকের গোয়েন্দা বিভাগ থেকে গোপন অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

এছাড়া পিকে হালদারের নেতৃত্বে ৪০ সিন্ডিকেটের মধ্যে পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেনসহ বেশ কয়েকজনের অর্থ আত্মসাতের দায়ের ২০টি মামলা হচ্ছে। পাসপোর্ট অফিসের ১৫০০ কোটি টাকার কেনাকাটায় নিুমানের মালামাল সরবরাহের অভিযোগে সংস্থার শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান শেষ করার ওপর জোর দিয়েছে কমিশন। সারা দেশে ই-পোস্ট অফিস নির্মাণের নামে ১০০০ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে ডাক অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক সুধাংশ শেখর ভদ্রসহ ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শিগগিরই অনুসন্ধান প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে।

ব্যাংকিং সেক্টরের মধ্যে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সাবেক এমডি ও এনসিসি ব্যাংকের সাবেক এমডি মোসলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ও এবি ব্যাংকে সাবেক চেয়ারম্যান এম. মোর্শেদ খান ও তার ছেলে ফয়সাল মোর্শেদ খানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগের অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে। অনুসন্ধান চলমান। এবি ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতা এরশাদ ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

অপরদিকে, হেফাজতের আমির বাবুনগরী ও মুফতি মামুনুল হকসহ ৪০ জন হেফাজত নেতার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেষ করতে চায় দুদক।

সূত্র জানায়, অগ্রাধিকারের তালিকায় বেসিক ব্যাংকের ৬১ মামলাও রয়েছে। যার তদন্তের অংশ হিসাবে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু ও পরিচালনা পর্ষদের ১০ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক। বেসিক ব্যাংকের সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি ও আত্মসাতের ঘটনায় দায়ের করা ৬১ মামলার তদন্তও দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে কাজ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

সংস্থাটির এক পরিচালক জানান, ভিআইপিদের বিরুদ্ধে চলমান সব তদন্ত নিষ্পত্তির জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু দুদকে তদন্তের আওতায় রয়েছেন। তাকে এর আগে ২০১৭ সালের শেষের দিকে এবং ২০১৮ সালের প্রথম দিকে কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। মামলা শেষ করতে তাকে আর নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন নেই। উচ্চ আদালতের নজর রয়েছে বাচ্চুর বিষয়ে দুদকের তদন্তের দিকে।

দুদকের মহাপরিচালক সাঈদ মাহবুব খান বলেন, কমিশন প্যান্ডিং অনুসন্ধান, তদন্ত শেষ করে নতুন কাজ শুরু করতে চাচ্ছে। এজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসছি। করোনা ও লকডাউনের কারণে কাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও আশা করি আগামী এক মাসের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিষ্পত্তি হবে। অনুসন্ধানের পর যেটা মামলা হওয়ার হবে। তাতে কে আসামি হবেন কে হবেন না তা বিবেচ্য নয়। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, ২০১১ বা ২০১২ সালের কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত পেন্ডিং আছে কিনা সেই তালিকা করা হচ্ছে। একইভাবে সালওয়ারী অন্যান্য বছরের সব অনুসন্ধান তদন্তের তালিকাও করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ক্যাসিনোকাণ্ডে এ পর্যন্ত ২৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার চার্জশিট আগামী এক মাসের মধ্যে দেওয়ার কাজ চলছে। একইভাবে ক্যাসিনো তালিকাভুক্ত অন্যদের বিরুদ্ধে আরও অন্তত ২০-২৫টি মামলার প্রস্তুতি চলছে। এগুলোতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও আসামি হতে পারেন বলে ধারণা দেন তিনি।

সূত্র জানায়, ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত চারজন এমপির বিরুদ্ধে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে রয়েছে। এ ছাড়া আরও দুজন এমপির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানও শেষ পর্যায়ে। কমিশন তাক লাগানোর মতো কিছু মামলা করতে চায় বলে জানান একজন এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহকারী অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া আসনের এমপি ও সংসদের হুইপ শামসুল হক চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, ভোলা-৩ আসনের এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন ও নারায়ণগঞ্জের এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুদক।

এদের কারও কারও নামে বিদেশ গমনেও নিষেধাজ্ঞা আছে। মানব পাচার ও অর্থ পাচারে জড়িত লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে সম্প্রতি বাদ পড়া এমপি কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল ও তার স্ত্রী সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিনা ইসলামের নাম রয়েছে অগ্রাধিকার তালিকায়। পাপুল ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দেশে তিন ব্যাংকের ৫টি হিসাবে ১৪৮ কোটি টাকা রহস্যজনক লেনদেনের তথ্য পেয়ে অভিযোগ দায়ের করে দুদক। ১৪০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পৃথক অনুসন্ধান হচ্ছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে পাপুল পরিবারের মোট ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে ৬১৭টি। এসব ব্যাংক হিসাব বর্তমানে আদালতের নির্দেশে জব্দ করে রেখেছে দুদক। তদন্ত কর্মকর্তারা শিগগিরই এ দুজনের বিষয়ে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে জানা গেছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

কয়েকজন আমলার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এই তালিকায় ১৮ জনের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিংয়ের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছে তথ্য চেয়েছে দুদক।

এননটেক্সের ইউনুছ বাদলের বিষয়ে দুদকের গোয়েন্দা সেল থেকে গোপন অনুসন্ধান চলছে। এ্যাননটেক্সের বিরুদ্ধে ৭০০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঋণের নামে জনতা ব্যাংক থেকে এই টাকা বের করে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের বিষয়টি অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান টিমের এক কর্মকর্তা।

ক্যাসিনোকাণ্ডে জিকে শামীম, যুবলীগের সাবেক নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, খালেদ মাহমুদ চৌধুরী, অনলাইন ক্যাসিনো সম্রাট সেলিম প্রধান, যুবলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিছুর রহমান, জাকির হোসেন, গেন্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন চৌধুরী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান পাগলা মিজান, রাজিব, আরমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের তদন্ত শেষ করেছে দুদক। তবে তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি।

এদের বাইরে ক্যাসিনো তালিকায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সাবেক পরিচালক লোকমান হোসেন, কলাবাগান ক্লাবের সাবেক সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ, ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ, জিকে শামীমের ক্যাসিয়ার সোহেল, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে, আবদুল হাই, নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হালিমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

 

সূত্র: যুগান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close