আন্তর্জাতিকআলোচিত

মের্কেল এবং বেশকিছু ইউরোপীয় নেতার পেছনে মার্কিন গুপ্তচর

আন্তর্জাতিক বার্তা : ডেনমার্কের গুপ্তচর সংস্থার সাথে জোট বেঁধে যুক্তরাষ্ট্র জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল সহ ইউরোপীয় বেশ কজন শীর্ষ রাজনীতিকের ওপর আড়ি পেতেছে- এমন একটি তদন্ত রিপোর্ট ফাঁস হওয়ার পর ইউরোপে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং ডেনমার্কের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে জার্মানি এবং ফ্রান্স, সুইডেন সহ ইউরোপের শক্তিধর কয়েকটি দেশের সরকার।ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা বিভাগের করা তদন্তের রিপোর্টটি ফাঁস করেছে ডেনমার্কেরই রাষ্ট্রীয় মিডিয়া – ডিআর।

সোমবার প্রচারিত ডিআরের এক রিপোর্টে বলা হয় ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সার পর্যন্ত ইউরোপে এই গুপ্তচরবৃত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ) কে গোপনে সাহায্য করেছে ডেনমার্কের গুপ্তচর সংস্থা ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এফই)।

২০১৩ সালে সিআইএ‘র সাবেক ঠিকাদার এডওয়ার্ড স্নোডেন- যিনি এখন রাশিয়ার আশ্রয়ে রয়েছেন – ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে স্পর্শকাতর গোপন সব তথ্য ফাঁস করেন, তার সূত্রে ডেনমার্ক ২০১৫ সালে ঐ তদন্ত শুরু করে। এতদিন তার ফলাফল জানা না গেলেও, সোমবার ডিআর গোপন সূত্রের মাধ্যমে তা ফাঁস করে দেয়।

ক্ষুব্ধ মের্কেল ও ম্যাক্রঁ
প্রতিবেশী মিত্র দেশগুলোর ওপর গুপ্তচরবৃত্তিতে আমেরিকার সাথে ডেনমার্কের এই যোগসাজশ নিয়ে ইউরোপে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ক্ষেপে গেছেন অ্যাঙ্গেলা মের্কেল। তিনি ডেনমার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

জার্মান কেন্দ্রীয় সরকারের একজন মুখপাত্র স্টেফান সেইবার্ট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট সমস্ত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে ব্যাখ্যার জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, গোয়েন্দা বিষয়ে খোলামেলা কথা বলা সরকারের নীতি নয়।

ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাক্রঁ। অ্যঙ্গেলা মের্কেলের সাথে এক বৈঠকের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেন, “ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে এ ধরণের তৎপরতা গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে।“ মিসেস মের্কেল সেসময় বলেন ফরাসি প্রেসিডেন্টের সাথে তিনি একমত।

তবে ডেনমার্ক এবং আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখনও এ নিয়ে কোনো কথা বলেনি। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রাইন ব্রামসেন, এই তদন্ত রিপোর্টের সত্যতাও স্বীকার করেননি, আবার এটি যে মিথ্যা-বানোয়াট তাও বলেননি। তবে ফরাসী বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, “ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ওপর পরিকল্পনা করে এ ধরণের গুপ্তচরবৃত্তি গ্রহণযোগ্য নয়।“ যখন এই গুপ্তচরবৃত্তি হয়েছে বলে বলা হচ্ছে সে সময় মিজ ব্রামসেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেননা ।

টার্গেট বহু ইউরোপীয় রাজনীতিক

শুধু জার্মান চ্যান্সেলর নয়, জার্মানি, ফ্রান্স সুইডেন এবং নরওয়ের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক এবং কর্মকর্তাদের ওপর কয়েক বছর ধরে আড়ি পাতা হয়েছে। ক্ষিপ্ত ঐ দেশগুলো ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এমা সোলবার্গ সেদেশের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম এসআরকে‘র সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “যে দেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে তারা যদি মিত্র দেশের ওপর এ ধরণের গুপ্তচরবৃত্তির প্রয়োজন বোধ করে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়না।“

অভিযোগ ঠিক কি?

ফাঁস হওয়া তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের রাজনীতিক এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ফোনালাপ, ইমেল এবং টেক্সট মেসেজের ওপর আড়ি পেতেছে যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ। এই গুপ্তচরবৃত্তি জন্য তারা ডেনমার্কের গুপ্তচর সংস্থা এফই‘র সাহায্য নিয়ে ড্যানিশ ইন্টারনেট ব্যবস্থায় আড়ি পেতেছে।

ইউরোপীয় ঐ রাজনীতিকদের টেলিফোনে কথাবার্তা এবং টেক্সট বার্তা চালাচালি হতো তার ওপর নজরদারি করতে পারতো এনএসএ। ডেনমার্ক ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের খুবই ঘনিষ্ঠ একটি মিত্র দেশ।

ডেনমার্কে ইন্টারনেট সাবমেরিন কেবলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে যার সাথে জার্মানি, ব্রিটেন, সুইডেন, নরওয়ে এবং হল্যান্ডের নেটওয়ার্কের সংযোগ রয়েছে। এই নেটওয়ার্কগুলোতে আড়ি পাতা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডিআর মিডিয়া বলছে, এনএসএর তৈরি এক্স-কি-স্কোর সামে একটি সফটওয়ার ব্যবহার করে ডেনমার্কের আশপাশের দেশগুলোতে ফোনকল, টেক্সট এবং চ্যাট মেসেজে আড়ি পাতা হয়েছে। আড়ি পাতার ঐ তৎপরতার গোপন নাম ছিল “অপারেশন ডানহ্যামার।“

ড্যানিশ প্রচার মাধ্যম ডিআর অন্তত নয়টি ভিন্ন ভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলেছে যারা ড্যানিশ গুপ্তচর সংস্থার কাছে রক্ষিত গোপন নথিপত্র দেখেছে।

জানা গেছে, মিসেস মের্কেল ছাড়াও সাবেক জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমেয়ার এবং সে সময়কার বিরোধী নেতা পিয়ার স্টেইনব্রাকের ওপর আড়ি পাতা হয়েছে।

মি স্টেইনবার্ক জার্মানির এআরডি টিভিকে বলেছেন, বন্ধু দেশের গোয়েন্দা সংস্থা যেভাবে কথাবার্তায় আড়ি পাতছে “এটা ঘৃণ্য।“ তিনি বলেন, “রাজনৈতিকভাবে এটি একটি কেলেঙ্কারি।“

বিশ্ব জুড়ে গুপ্তচরবৃত্তির জাল

ইউরোপের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আড়ি পাতার প্রথম এ ধরনের অভিযোগ ওঠে ২০১৩ সালে। সিআইএর সাবেক ঠিকাদার এডওয়ার্ড স্নোডেন সে সময় প্রথম অভিযোগ করেন যে এনএসএ জার্মান চ্যান্সেলর মের্কেলের ফোনে-ইমেলে আড়ি পাতছে।

ঐ কথা সে সময় হোয়াইট হাউজ প্রত্যাখ্যান করেনি। তবে বলা হয়েছিল এখন মিসেস মের্কেলের ফোনে আড়ি পাতা হচ্ছেনা, এবং ভবিষ্যতেও হবেনা।

সোমবার ডেনমার্কের মিডিয়ায় ফাঁস হওয়া রিপোর্টের পর মি স্নোডেন টুইট করে বলেছেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সে সময় এই গুপ্তচর কেলেঙ্কারির সাথে “ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।“ মি স্নোডেন লিখেছেন, “ডেনমার্ক এবং তাদের সিনিয়র মিত্রকে (যুক্তরাষ্ট্র) পুরো বিষয়টি খোলাসা করতে হবে।“

আমেরিকা থেকে পালিয়ে গিয়ে মি স্নোডেন শুধু ইউরোপের ওপর আড়ি পাতার কথাই বলেননি, তিনি অভিযোগ করেছিলেন চীন সহ বিশ্বের নানা দেশের রাজনীতিক এবং কর্মকর্তাদের ওপর ওপর আড়ি পাতছে আমেরিকান গুপ্তচরেরা।

দেশ থেকে প্রথম হংকংয়ে পালিয়ে গিয়ে মি স্নোডেন সেখানে দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ সারা বিশ্বের ৬১ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর হ্যাকিং অপারেশন চালাচ্ছে। স্নোডেন বলেছিলেন প্রতিটি কম্পিউটারে হ্যাকিং না করে এনএসএ “বড় বড় ইন্টারনেট রাউটারে“ অর্থাৎ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের মূল কাঠামোতে হ্যাকিং করে। ফলে, ঐ সব রাউটারের আওতায় সমস্ত কম্পিউটারে তারা নজরদারি করতে পারে।

২০১৪ সালে জুনে জার্মানির একটি দৈনিকে খবর বের হয় ওয়াশিংটনে এবং জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে আড়ি পেতেছে এনএসএ। এমনকি ব্রাসেলসে ইইউ অফিসেও ইলেকট্রনিক যন্ত্র বসিয়ে আড়ি পাতা হয়েছে।

ঠিক কি ধরণের তথ্য মার্কিন গোয়েন্দারা জোগাড় করতেন তা পরিষ্কার নয়। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাণিজ্য এবং সামরিক বিষয়ে ইউরোপীয় জোটের অবস্থানের ওপর নজরদারি করা হয়েছে।

চ্যান্সেলর মের্কেলের মোবাইল ফোনে আড়ি পাতা হয় – এমন রিপোর্ট বের হওয়ার পর ২০১৪ সালের ২৪শে অক্টোবর বার্লিনে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছিল যা খুবই বিরল একটি ঘটনা। মিসেস মের্কেল তখন এতটাই ক্ষেপে গিয়েছিলেন যে তিনি প্রায় সাথে সাথে সে সময়কার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে টেলিফোনে কথা বলেন।

ফ্রান্সের লাখ লাখ ফোন কলে আড়ি পাতা হয়েছে – এমন রিপোর্টের পর তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোয়া অঁলদ তীব্র ক্ষোভ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

২০১৪ সালের জুলাইতে লন্ডনের পত্রিকা গার্ডিয়ানের এক রিপোর্টে বলা হয় বিশ্বের ৩৫ জন নেতার ফোনালাপে আড়ি পেতেছে এনএসএ। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশের ৩৮টি দূতাবাস এবং মিশনের ওপর আড়ি পাতা হয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে ছিল ফ্রান্স, ইটালি, গ্রীস, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারত। এগুলোর সবই আমেরিকার মিত্র দেশ।

২০১৪ সালের ১০ই জুলাই ব্রাজিলের একটি পত্রিকায় রিপোর্ট হয় যে এনএসএ পুরো দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে তাদের গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে। ২০০২ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলিয়ান টেলিকম এজেন্সি মার্কিন গুপ্তচরদের সাহায্য করেছে। ঐ রিপোর্টে আরো বলা হয় যে মেক্সিকো এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের মধ্যে ফোন কল, ই-মেলে আড়ি পাতা হয়েছে।

রিপোর্টটি প্রকাশের পর ক্ষুব্ধ তৎকালীন ব্রাজিলিয়ান প্রেসিডেন্ট ডিলমা রুসেফ যুক্তরাষ্ট্রে তার নির্ধারিত সফর বাতিল করে দিয়েছিলেন।

এসব খবরের মূল সূত্র ছিলেন এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথিপত্র।

মার্কিন সরকার সেসময় এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেনি।। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তখন বলেছিলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার তৎপরতা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

 

সূত্র: বিবিসি

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close