ইতিহাস-ঐতিহ্যগাজীপুরসারাদেশ

শত বছরেরও বেশি সময় যাবৎ বিরামহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছে আড়িখোলা রেলস্টেশন

বার্তাবাহক ডেস্ক : স্বাছন্দ্যে এবং নিরাপদে ভ্রমণের জন্য রেলপথ হল আদর্শ। সারা পৃথিবীতেই অন্য যে কোন মাধ্যমের চেয়ে রেলপথে ভ্রমণ যেমন আরাম তেমনি নিরাপদ। একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা উন্নত তা অনেক সময়ই নির্ধারিত হয় সেদেশের রেল যোগাযোগ কতটা উন্নত তার উপরে। বাংলাদেশে রেলপথের কার্যক্রম অনেক অনেক পুরোনো, সেই বৃটিশ আমলের। তাঁরা সেসময়েই সমগ্র উপমহাদেশে জালের মত ছড়িয়ে দিয়েছিল রেলের নেটওয়ার্ক। দেশভাগ হবার পর বাংলাদেশের ভাগে যেটুকু রেললাইন পরে তাঁর উপর ভিত্তি করেই আজকের বাংলাদেশ রেলওয়ে দাঁড়িয়ে আছে

যাত্রীবান্ধব বাহন হিসেবে রেলের সুনাম সেদিন থেকেই, যেদিন থেকে পৃথিবীর বুকে রেলগাড়ি চলতে শুরু করেছে। নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা, আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা, প্রকৃতির হাতছানি, ক্লান্তিহীন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, বিলাসী ভ্রমণ, কিংবা নিরাপদ যাত্রা; সবখানেই রেলের কর্তৃত্বটা সব থেকে বেশি। রেল হচ্ছে স্থলপথের সবচেয়ে নিরাপদ বাহন। স্থলপথে যোগাযোগের জন্য কিংবা ভ্রমণের জন্য রেলের চেয়ে পরিবেশবান্ধব এবং নিরাপদ বাহন আর দ্বিতীয়টি নেই। তাছাড়া রেল স্থলপথের অন্যান্য বাহনের চেয়ে তুলনামূলক গতিশীল হয়ে থাকে। খুব কম সময়ের মধ্যেই পৌঁছানো যায় দূর গন্তব্যে। তাই যুগ যুগ ধরে রেল ভ্রমণের আনন্দ এবং রেলের সুবিধা বিবেচনায় স্থলপথের বাহন হিসেবে এর গুরুত্ব ছিল সবথেকে বেশি।

ছবি সংগৃহীত

ঔপনিবেশিক অঞ্চলের মতো ভারতবর্ষেও রেলওয়ে এসেছে ব্রিটিশদের হাত ধরে। সে সময় উপমহাদেশে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো একচেটিয়াভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছিল। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিল না তারা। ততদিনে ইউরোপে রেলপথ আবিষ্কারের ফলে শিল্পখাতে এক বিপ্লব ঘটে যায়। একটা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা শিল্পায়নের চাবিকাঠি হলো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। তাই শিল্পখাতে উন্নয়ন করার জন্য ভারতবর্ষে রেলপথ নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে রেল বিপ্লব সংঘটিত হলে শিল্প-বাণিজ্য এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। সেই সুবিধাদি বিবেচনায় ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় উপমহাদেশে রেলপথ স্থাপন নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন। এই পরিকল্পনা যতটা না ছিল এদেশের মানুষের সুবিধার জন্য, তার থেকে বেশি জড়িত ছিল ব্রিটিশদের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সুবিধা এবং তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ।

gazipurkontho
ছবি সংগৃহীত

জানা যায়, ১৮৩২ সালে ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে রেলপথ নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তবে বাংলায় সর্বপ্রথম রেলওয়ে এসেছে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানির হাত ধরে। ১৮৯২ সালের ১৮ই মার্চ ইংল্যান্ডে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে (এবিআর) কোম্পানির রেজিষ্ট্রেশন হয়। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর স্থাপিত হয় চট্রগ্রামে। এই কোম্পানিই পূূর্ববাংলার পূর্বাঞ্চলীয় রেলরুট ও আসামে রেলওয়ে প্রতিষ্ঠা করে। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি এদেশে রেলপথ নির্মাণের দায়িত্ব নিয়ে ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ১৫০ কিমি মিটারগেজ লাইন এবং লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৬৯ কিমি রেললাইন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে। ১৮৯৬ সালে কুমিল্লা-আখাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ স্থাপন করা হয়। ১৯০৩ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পরিচালনায় বেসরকারি লাকসাম-নোয়াখালী রেল শাখা চালু হয়। ১৯০৫ সালে এই লাইনটি সরকার কিনে নেয়, এবং ১৯০৬ সালে ১ জানুয়ারি আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে একীভূত করে দেয়। টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়ার মধ্যে রেললাইন স্থাপিত হয় ১৯১০ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে। সে সময় টঙ্গী-আখাউড়া রেল লাইনের স্টেশন হিসেবে আড়িখোলা রেলওয়ে স্টেশনটি তৈরি করা হয়। যা চালু হয়েছিলো ১৯১৫ সালে। তবে স্টেশন চালুর  সঠিক তারিখ জানা সম্ভাব হয়নি।

সেই সময় থেকেই বর্তমান কালীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত আড়িখোলা রেলস্টেশন থেকে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন চলছে। আর সেই থেকেই শত বছরেরও বেশি সময় যাবৎ আড়িখোলা রেলস্টেশনটি যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছে বিরামহীন ভাবে।

ছবি সংগৃহীত

সড়ক পথে যাতায়াতের সুবিধার ফলে আড়িখোলা রেলস্টেশনে যাত্রীর সংখ্যা কমছে দিন দিন। তবে এক সময় যাত্রীবান্ধব বাহন হিসেবে ট্রেনই ছিলো সকলের প্রথম পছন্দ।

আড়িখোলা-ঢাকা এই পথে ট্রেন চলাচল শুরুর সময় (১৯১৫ সালে) ১০/১২ ট্রেন চলাচল করতো। সে সময় মেইল ট্রেন, মিক্সট ট্রেন (যাত্রী ও মালামাল) এবং সাধারণ এই তিন শ্রেণীর ট্রেন চলতো। বেশিরভাগ ট্রেনই সে সময় আড়িখোলা রেলস্টেশন যাত্রাবিরতি দিতো।

সে সময় আড়িখোলা রেলস্টেশন ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। এরমধ্যে তিনজন স্টেশন মাস্টার , চারজন পয়েন্টম্যান, ৩ জন বুকিং সহকারী, ২ জন পোর্টার, ২ জন ল্যাবম্যান রেলস্টেশনটি পরিচালনা করতেন।

মাঝখানে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দড়িপাড়া এলাকায় থাকা আশকর বাড়ি রেল ব্রিজ এবং আড়িখোলা রেলস্টেশনের পূর্ব দিকে বর্তমানে পৌর এলাকার গোলাবাড়ী রেল ব্রিজটি ভেঙ্গে দিয়ে পাকিস্তানী সেনা বাহিনীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। সে সময় কিছুদিন বন্ধ ছিলো এই রেল যোগাযোগ।

মুক্তিযোদ্ধাকালীন কালীগঞ্জ থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা বদরুজ্জামান খসরুর বলেন, ”স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনী নরসিংদী ও পূবাইল এলাকা থেকে রেলযোগে কালীগঞ্জে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমে দড়িপাড়া এলাকায় থাকা আশকর বাড়ি রেল ব্রিজ থেকে রেললাইন উঠিয়ে ফেলা হয়। পরে পাক হানাদার বাহিনী তা মেরামত করে পূণরায় রেল সচল করে। এরপর ওই মাসেই পাক হানাদার বাহিনীকে আটকানোর পরিকল্পনা করে আশকর বাড়ি রেল ব্রিজ এবং গোলাবাড়ি রেল ব্রিজ ভেঙ্গে দেই আমিসহ মুক্তিযোদ্ধারা।”

এদিকে ২০১১ সালের ২১ জুন টঙ্গী থেকে ভৈরববাজার স্টেশন পর্যন্ত ডাবল রেললাইন নির্মাণের জন্য সিগন্যালিং সহ টঙ্গী থেকে ভৈরব পর্যন্ত ৬৪ কিলোমিটার ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১১ সালের ২ নভেম্বর। বাংলাদেশ সরকার (জিওবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে রেলপথ মন্ত্রণালয় এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন করে। এ জন্য খরচ হয়েছে দুই হাজার ২১২ দশমিক ৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি এক হাজার ৮২৩ দশমিক ৯ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার ৩৮৯ দশমিক ৫২ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে।

২০১৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেলা ১১টার দিকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এবং রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক ভৈরববাজার স্টেশন চত্বর থেকে টঙ্গী-ভৈরববাজার ডাবল লাইনের উদ্বোধন করেন।

প্রকল্পের অধীনে ১১টি নতুন স্টেশন বিল্ডিং ও দুইটি সিগন্যালিং ইকুইপমেন্ট ভবন, ৭১টি ব্রিজ-কালভার্ট, ১৩টি স্টেশন, ২৩টি প্ল্যাটফর্ম, ১১টি স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, পাঁচটি লেভেল ক্রসিং এবং ১১টি পুরাতন লেভেল ক্রসিংয়ের উন্নয়ন করা হয়।

ওই প্রকল্পে আড়িখোলা নতুন স্টেশন বিল্ডিং নির্মাণ ও স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয়।

ছবি সংগৃহীত

আড়িখোলা স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আড়িখোলা হয়ে আন্তঃনগর ও মেইল ট্রেন মিলে ১৭ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। কিন্তু মাত্র ৪টি ট্রেন যাত্রাবিরতি করে ঢাকা যাওয়ার পথে। এই স্টেশন থেকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচশত যাত্রী ঢাকার পথে যাওয়া-আসা করে।

আরো জানা গেছে, বর্তমানে স্টেশনটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন পাঁচজন। অথচ ১৯১০-১৯১৪ সময়েও এখানে ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। এখন আগের তুলনায় যাত্রী ও ট্রেনের সংখ্যা বাড়লেও লোকবল ২.৮ গুণের বেশি কমে গেছে।

ছবি সংগৃহীত

আড়িখোলা স্টেশনের মাস্টার আব্দুল মালেক মন্ডল বলেন, ”আড়িখোলা স্টেশনে ন্যূনতম সেবা দেওয়ার জন্য কমপক্ষে ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন। বর্তমানে লোকবল কম থাকায় এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপ যেমন বেশি পড়ছে, যাত্রীরাও প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছে না। বর্তমানে স্টেশনটিতে তিনজন স্টেশন মাস্টার আছেন, চারজন পয়েন্টম্যান থাকার কথা থাকলেও আছেন দুইজন। আগে আরো ৩ জন বুকিং সহকারী, ২ জন পোর্টার, ২ জন ল্যাবম্যান কর্মরত থাকলেও এখন ওই পদে কেউ নেই।”

আব্দুল মালেক মন্ডল আরো বলেন, ”ঢাকা যাওয়ার পথে চারটি মেইল ট্রেন (আপ) আড়িখোলা স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেইল ভোর ৫টা ২৩ মিনিটে, সিলেট মেইল সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে, তিতাস কমিউটার ৭টা ২৬ মিনিটে এবং কর্ণফুলী এক্সপ্রেস সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে আড়িখোলা স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়।”

”ঢাক থেকে ফেরার পথে (ডাউন) কর্ণফুলী এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে, তিতাস কমিউটার সন্ধ্যা ৬টা ৫২ মিনিটে এবং নোয়াখালী এক্সপ্রেস রাত ৮ টা ৩২ মিনিটে যাত্রাবিরতি দেয়।”

”তবে আড়িখোলা স্টেশনে কোন আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই বলেও জানান তিনি।”

আরো জানতে…………..

কালীগঞ্জ নির্বাচনী এলাকা থেকে যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন

তৎকালীন ‘কালীগঞ্জ হাই ইংলিশ স্কুল’ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

বস্ত্র শিল্পের এক ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মসলিন কটন মিল’

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close