সারাদেশ

টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড অফিসে শিল্প খারিজে দফায় দফায় দিতে হয় ঘুষ

এক শিল্প খারিজের জন্য পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা নেয়া হয় * ভূমি কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও এসি ল্যান্ড পান এ টাকার ভাগ

বার্তাবাহক ডেস্ক : টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলে শিল্প প্রতিষ্ঠানের খারিজ নিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে দফায় দফায় ঘুষ দিতে হয়। একটি শিল্প খারিজে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা খরচ করতে হয় আবেদনকারীকে।

সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, এসি ল্যান্ড অফিসের সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার, কানুনগো মোবারক উল্যা এবং এসি ল্যান্ড শারমিন আরা পান সেই ঘুষের ভাগ। এমনকি শিল্প খারিজে ঘুষের রেট বাড়াতে মাসের পর মাস ফাইল আটকে টালবাহানা করা হয়।

কখনও কখনও শিল্প খারিজের ফাইল তার অফিসে না পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশও দেন এসি ল্যান্ড শারমিন আরা। ভুক্তভোগী, সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস সূত্র এবং একাধিক দালাল এসব তথ্য জানিয়েছে।

মাসকো গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজার হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দেড় বছর আগে টঙ্গীর সাতাইশ ও কাকিল সাতাইশ মৌজায় দুটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামে খারিজের আবেদন করা হয়। সেই থেকে দুটি ফাইল এসি ল্যান্ড অফিসে আটকে ছিল।

দফায় দফায় এসি ল্যান্ড শারমিন আরাকে তাগাদা দেয়া হলেও তিনি ফাইল নিষ্পত্তি করছিলেন না। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস না থাকলে তিনি আবেদন বাতিল করে দিতে পারেন, অথবা ডকুমেন্টস চাইতে পারেন। তিনি তা না করে ফাইল ফেলে রাখেন। এতে আমাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’

সূত্র জানায়, প্রতিটি ফাইলে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পাওয়ার পরই এসি ল্যান্ড অফিস থেকে ফাইলগুলোর নিষ্পত্তি করা হয়। টঙ্গী ভূমি অফিস এবং এসি ল্যান্ড অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা খরচের নামে দফায় দফায় ঘুষ নেন।

এদিকে এসি ল্যান্ড অফিসের একজন দালাল যুগান্তরকে বলেন, ‘শিল্প খারিজের জন্য পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা খরচ করতেই হবে। এ টাকা না পেলে এসি ল্যান্ড অফিসের কর্মকর্তারা ফাইল নিষ্পত্তি না করে ফেলে রাখেন। শিল্প খারিজের আবেদনের পর দালালদের মাধ্যমে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার। পরে দফায় দফায় তিনি ঘুষ আদায় করেন। ঘুষ না দিলে ফাইল আর নিষ্পত্তি হয় না। যত বেশি দিন ফাইল আটকে থাকে তার রেটও বাড়তে থাকে।’

এ বিষয়ে টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড শারমিন আরার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। তার মোবাইল ফোনে ম্যাসেজ পাঠিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে মঙ্গলবার তিনি বলেছিলেন, ‘কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে তিনি জড়িত নন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমি কোনো ধরনের ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই। কারও কাছ থেকে ঘুষ নেই না।’

মণ্ডল গ্রুপের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় মণ্ডল গ্রুপ তিনটি শিল্প কারখানা স্থাপন করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে জমি ক্রয় করে। গত এপ্রিলের শুরুর দিকে টঙ্গী ভূমি অফিসে তিনটি ফাইল খোলা হয়। ওই ফাইল তিনটির নম্বর হচ্ছে ২৯৭৬, ২৯৭৭ এবং ২৯৭৮। এ ফাইলগুলো চার মাসেও এসি ল্যান্ড অফিসে পাঠাননি টঙ্গী ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এসএম মান্নান। অথচ ফাইল এসি ল্যান্ড অফিসে পাঠানোর জন্য টঙ্গী ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্টদের খরচ (ঘুষ) দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে এসএম মান্নান তাদের বলেছেন, এসি ল্যান্ড স্যার ফাইল পাঠাতে নিষেধ করেছেন। পরিবেশ অধিদফতরের নিষেধ আছে জানিয়ে তিনি ফাইল পাঠাতে নিষেধ করেছেন।’

মণ্ডল গ্রুপের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘টঙ্গী ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এসএম মান্নান নানাভাবে বুঝিয়েছেন খরচ (ঘুষ) না দিলে ফাইল এসি ল্যান্ড অফিসে যাবে না। একজন এসি ল্যান্ড ফাইল না পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারেন না। তিনি যাচাই-বাছাই করে ফাইল পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারেন। আইনে বাধা থাকলে তিনি আবেদন বাতিল করে দিতে পারেন। তবে সংশ্লিষ্টরা আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন, ঘুষ দিলে ফাইল আটকে থাকবে না।’

টঙ্গী ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এসএম মান্নান দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার তিনি বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সংযুক্ত থাকলে তিনি পরীক্ষা করে এসি ল্যান্ড অফিসে ফাইল পাঠিয়ে দেন। তিনি কারও কাছ থেকে ঘুষ নেন না।’

ভুক্তভোগীরা জানান, যদি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস বা অন্য কোনো ধরনের সমস্যা থাকে তবে আবেদন বাতিল করে আবেদনের নিষ্পত্তি করে দিতে পারেন এসি ল্যান্ড। কিন্তু ফাইল নিষ্পত্তি না করে মাসের পর মাস আটকে রাখেন টঙ্গীর এসি ল্যান্ড শারমিন আরা।

ফাইল নিষ্পত্তি না করলে বিপাকে পড়েন আবেদনকারীরা। এতে ঘুষের রেটও বেড়ে যায়। এ সুযোগে অফিসের সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার ও কানুনগো মোবারক উল্যা আবেদনকারীদের কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। তাদের চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিলেই কেবল ফাইল নিষ্পত্তি হয়।

 

 

এ সংক্রান্ত আরো জানতে….

টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসে দলিল ঘষা-মাজা করে নামজারি!

টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড শারমিনের পদায়নেই ‘ঘাপলা’

টঙ্গী এসি-ল্যান্ড অফিসে দালালদের ‘রাজত্ব’

টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসে ‘জুয়াড়ি সিরাজের’ নেতৃত্বে সক্রিয় শক্তিশালী চক্র

সূত্র: যুগান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close