অন্যান্য

উপহার, উপঢৌকন আর উৎকোচ একই সুতোয় গাঁথা

মাহবুব আলম : উপহার ও উপঢৌকন শব্দ দুটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে প্রায় কাছাকাছি হলেও প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক অর্থে রয়েছে বিশাল ফারাক। উপহার সাধারণত শ্রদ্ধাবনত, নম্র নিবেদিত এবং প্রায়ই নিরশব্দ। উপঢৌকন প্রতিতুলনায় উচ্চকণ্ঠ, ঢঙ্কানিনাদে যার উপস্থিতি সবই সরব।

উপহার আর উপঢৌকনের যাত্রা ইতিহাসের একই পর্বে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপহার-উপঢৌকনের বিকাশ হয়েছে একই পথ পরিক্রমায়। সামাজিক বিবর্তনে, রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের দাপটে উপহার কালক্রমে মেদবহুল হয়ে একসময় রূপান্তরিত হয়ে গেল জমকালো উপঢৌকনে। যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রসারের কারণে উপঢৌকনের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা অচিরেই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে গেল। ফলে দেশ-বিদেশের প্রায় সব সমাজেই উপঢৌকন পাঠানো ও গ্রহণ প্রায় একটা রীতিতে পরিণত হয়ে গেল। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ, শান্তি চুক্তি-সন্ধি, বাণিজ্য সুবিধা আদায়ে উপঢৌকনের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর এরই ধারাবাহিকতায় উপঢৌকন আর উৎকোচের ভেদরেখা যে কখন মুছে গেল, তা আজ জানার আর উপায় নেই। মোগল আমলের শেষ দিনগুলো থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্তিম সময় পর্যন্ত উপঢৌকন তথা উৎকোচের বাড়াবাড়ি ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে। পরবর্তীতে ব্রিটিশরাজ ভারতে একে নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন নানা বিধি-নিষেধ ও আইনের বেড়াজাল দিয়ে।

উপমহাদেশে উপঢৌকনের প্রথম নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়েছিল ব্রিটিশের ভারতীয় প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার সংকল্প থেকে। উপঢৌকন তখনো ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি তাদের আনুগত্যের স্বীকৃতি হিসেবে দেয়া হলেও তা কখনো সেসব কর্মচারীর ব্যক্তিগত ভোগে ব্যবহার হয়নি, বরং প্রাপ্ত উপঢৌকন সরাসরি জমা হতো রাজকোষে। সবচেয়ে বড় কথা, ওই সময়ে মোহর বা স্বর্ণমুদ্রা উপঢৌকন হিসেবে প্রদান-গ্রহণ বন্ধ করে দেয়া হয়।

আর দেশীয়দের পক্ষ থেকে অর্থ বা ধনরত্ন উপঢৌকন হিসেবে পাওয়ার পরিবর্তে ব্রিটিশ রাজশক্তির কাছে সেরা উপঢৌকন হিসেবে বিবেচিত হতো তাদের পাণ্ডিত্য, শ্রম ও একনিষ্ঠ রাজসেবা। এ সময়ে এসে উপঢৌকন নতুন চেহারা বা নতুন রূপ ধারণ করল। দেশীয়রা সরাসরি ব্রিটিশরাজকে অর্থ প্রদান না করে তারা নানা জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করে তাদের সুনজরে পড়ার কাজে ব্রতী হলেন। ফলে নানা উদ্যোগে উপঢৌকনের অর্থশক্তি কল্যাণকর জনসেবায় ব্যয় হতে শুরু করল। যেমন— সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, দীঘি কাটা, স্কুল-কলেজ তৈরি করা, হাসপাতাল নির্মাণ, রাস্তাঘাট বা সেতু তৈরি করা, দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে অন্ন বা বস্ত্রদান প্রভৃতি কাজের মাধ্যমে দেশীয় ধনপতিরা ব্রিটিশ রাজশক্তির নেক নজরে পড়ার চেষ্টা করতে শুরু করলেন। উপঢৌকন প্রদানের এ নতুন কৌশল বেশ ফলপ্রসূই হয়েছিল বলা যায়। কারণ এসব কাজের বিনিময়ে ব্রিটিশরাজের নানা অনুগ্রহ, নানা সুবিধা ও নানা খেতাব— খান বাহাদুর, রায় বাহাদুর, নবাব বাহাদুর, রাজা, মহাশয় ইত্যাদি জুটতে শুরু করল।

উপহার প্রথা পৃথিবীতে নতুন কিছু নয়, অতি পুরনো। মানবিক গুণের যেখানেই সামান্যতম বিকাশ ঘটেছে, সেখানেই উপহার বিনিময় পুষ্পিত হয়েছে। সভ্য মানুষের প্রত্ন ইতিহাসের হাত ধরে উপহার প্রথার এমন কিছু অনন্য দৃষ্টান্তও আমরা পাই, যার ঐতিহাসিক মূল্যও অসামান্য। এখানে যিশু খ্রিস্টের জন্মের বহু বছর আগে গৌতম বুদ্ধের সময়ের একটি অসাধারণ উপহার কাহিনী সংক্ষেপে উল্লেখ করা যেতে পারে। এ উপহারটির সঙ্গে ভক্তের নির্মল শ্রদ্ধা আর বহুজনের হিতাকাঙ্ক্ষা ব্যতীত অন্য কোনো জাগতিক কামনা জারিত ছিল না।

চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের বিবরণে আছে— গৌতম বুদ্ধ বিহার স্থাপনের জন্য জায়গা খুঁজছিলেন। অনেক খোঁজার পর শ্রাবন্তীর একটি বন তার পছন্দ হলো। শ্রাবন্তীর রাজা প্রসেনজিতের ছেলে জেতের সাজানো বাগান ছিল এ বনটি। জেতে প্রথমে বাগানটি বিক্রি করতে চাননি, পরে মত পরিবর্তন করে বাগানের জন্য অসম্ভব একটি দাম প্রস্তাব করলেন। জেতে প্রস্তাব দিলেন: গোটা বাগান স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কোথাও একটুও যেন মাটি দেখা না যায়। এ এক অসম্ভব দাবি! বুদ্ধের পরম এক ভক্ত শ্রাবন্তীর সুদত্ত— যিনি পরবর্তীতে ভিক্ষু অনাথ পিণ্ডক নামে অধিক পরিচিত হয়েছিলেন— তিনি এগিয়ে এলেন গরুর গাড়িভর্তি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে। প্রাচীন খোদাই চিত্র থেকে দেখা যায়, দুজন লোক স্বর্ণের টাকা দিয়ে মাটি ঢাকছে, একজন আরেকজনের হাতে ইটের পরিবর্তে স্বর্ণমুদ্রা তুলে দিচ্ছে। পরে অনাথ পিণ্ডকের এসব স্বর্ণমুদ্রা রাজপুত্র জেতে বিহার তৈরির জন্য বুদ্ধদেরকেই দিয়ে দিলেন। এবং এ থেকে এ বিহারের নাম হলো জেতেবন বিহার অনাথ পিণ্ডকের আশ্রম। বর্ষাকালে গৌতম বুদ্ধ এখানেই বিশ্রাম করতেন।

এছাড়া বৈশালীর রাজনর্তকী আম্রপানীও তাকে আম্রবন উপহার দিয়েছিলেন। আর এটাও নিঃসন্দেহে ভক্তহূদয়ের নির্মল উপহার ছাড়া আর কিছু নয়।

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পরও যুগ যুগ ধরে জেতেবন বুদ্ধবিহার ভক্তরা ব্যবহার করছেন। তবে এর বর্তমান নাম হয়েছে সাহেত আর শ্রাবন্তীর নাম হয়েছে মাহেত।

পরের উদাহরণটির সময়কাল আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে যিশুর জন্মবৃত্তান্তকে ঘিরে: বেথেলহেমে একটি নিষ্কম্প তারা অনুসরণ করে প্রাচ্য থেকে তিন বিজ্ঞ সাধু শিশু যিশুর জন্য উপহার নিয়ে এসেছিলেন। তারা তিনটি পাত্রে তিন ধরনের উপহার এনেছিলেন। উপহারগুলো এমন কিছু নয়, তবে এর প্রতীক ও তাত্পর্য খ্রিস্ট ধর্মে অসীম।

উপহারগুলো হলো— (১) একটা স্বর্ণের টুকরো (২) লোবান (৩) সুগন্ধির নির্যাস। তিনটি উপহারেই রয়েছে দাতাদের হূদয়ের ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া।

আগেই বলা হয়েছে, উপঢৌকনের রয়েছে নানা বর্ণ, চিত্র ও চরিত্র। অনেক সময় উপঢৌকনের গায়ে সাঁটা থাকে একটা জমকালো খোলসও। আর ওই খোলসের নিচেই থাকে আসল উপঢৌকনের আসল রূপ। সিংহভাগ ক্ষেত্রে উপঢৌকনের মোড়কে মানুষ চায় তার উদ্দেশ্য সিদ্ধি করতে। এ-জাতীয় উপহারকে আমরা প্রায় উৎকোচের সমার্থক বলেই ধরে নিতে পারি। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে রাজা-মহারাজার অধীনস্থ শাসক কিংবা সামন্ত প্রভু ও বণিকরা নানা রকম উপহার দিতে আসছেন। উদ্দেশ্য, ওই উপঢৌকনের অছিলায় কোনো মনোযাঞ্চা পেশ করা। বাণিজ্য, কর মওকুফ এসব উদ্দেশ্যই উপঢৌকনের মধ্যে লুক্কায়িত থাকত। ফলে উপহার-উপঢৌকনকে সাদা বাংলায় বলা চলে ভ্যাট। তবে ভ্যাট হলেও রাজার কাছে এ ভ্যাটের তাত্পর্য ছিল অসীম। রাজা এ উপহার গ্রহণ করতেন। কারণ এ শুধু উপহার নয়, এ আনুগত্য প্রকাশের সর্বজন মান্য পন্থাও। ফলে আনুগত্য প্রকাশের বিনিময়ে রাজার কিছুটা রাজানুগ্রহ তো উপহারদাতার ললাটে জুটবেই। ইতিহাসে দেখা যায় এমন নজিরও আছে: অনেক রাজা তার কন্যাকে উপহার দিয়েছেন বিয়ের পাত্রী হিসেবে। উদ্দেশ্য, বিয়ের মাধ্যমে মৈত্রী বা নিরাপত্তা সৃষ্টি করা। মোগল যুগে রাজপুত্রদের রাজকন্যা বিয়ে করা এ উদ্দেশ্যেই প্রচলিত হয়েছিল।

এবার অষ্টম শতাব্দীর ইতিহাস বিখ্যাত নৃপতি ইউরোপের ফ্রাংক শাসক শার্লেমান ও বাগদাদের খলিফা হারুন-আল রশীদের কাহিনী শোনা যাক। ইউরোপের শার্লেমানের রাজ্যের সঙ্গে বাগদাদের খলিফা হারুন-আল রশীদের রাজ্যের মধ্যকার দুস্তর দূরত্ব থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক আদান-প্রদান ছিল, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। আর এ বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুসংহত করতে নিয়মিত দুই রাজ্যের মধ্যে দূত বিনিময় বজায় ছিল। আর সে সময়ে এটা একটা অপরিহার্য রীতিতে পরিণত হয়েছিল যে, দূত মারফত শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ উপহারসামগ্রী পাঠানো। শার্লেমান আর হারুন-আল রশীদের মধ্যে এ রকমই দূত মারফত উপহার পাঠানোর দলিল রয়েছে প্যারিসের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে, যা ঐতিহাসিক দিক থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খলিফা হারুনের শার্লেমানকে পাঠানো উপহারটি ছিল পারস্যের বাদশা দ্বিতীয় খসরুর একটি স্বর্ণের ফ্রেমে বাঁধানো রত্নখচিত থালা। থালার কেন্দ্রে ছিল বাদশাহর প্রতিকৃতি। শার্লেমানের মৃত্যুর পর তার পৌত্র সেন্ট ডেনিস উপহারটি একটি মঠে পাঠিয়ে দেন। ফরাসি বিপ্লবের পর তা মঠ থেকে উদ্ধার করে এনে সংরক্ষণ করা হয় প্যারিসের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। অষ্টম শতাব্দীর পশ্চিম ইউরোপ আর মধ্য এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রতীক কিংবা স্মারক হয়ে হয়ে আছে থালাটি। কাজেই এটা সহজেই অনুমেয়, এ থালার অন্য পিঠে ছিল হারুনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের বার্তা। এ উপঢৌকনের সেটিই ছিল আসল উদ্দেশ্য— আর বাণিজ্য সম্পর্কের সুদৃঢ়করণের মধ্যে উভয় রাজ্যের স্বার্থই নিহিত ছিল।

শার্লেমানের প্রায় ১০ বছর পর বাংলার এক স্বাধীন সুলতান একটি অভিনব উপহার পাঠিয়ে চীনের মিঙ্গ বংশের সম্রাটকে ভীষণ রকম চমত্কৃত করেছিলেন। বাংলার সুলতানের মিঙ্গ সম্রাট ইয়াং-লোকে পাঠানো এমন অভিনব উপহার চীনের জনগণ আগে কখনো দেখেনি বা তার নামও শোনেনি। পিকিং শহরের ছেলে-বুড়ো সবাই এ উপহার দেখে স্তম্ভিত ও বিস্মিত হয়েছিল। রাজধানীজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। ঘটনাটির তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর, ১৪১৪। চীনা এ রাজপ্রাসাদে বাংলা থেকে হাজির হওয়া উপহারটি ছিল একটি চতুষ্পদ জানোয়ার, আফ্রিকার লম্বা গলার জিরাফ; যার দর্শনীয় লীলায়িত ভঙ্গি ও তরঙ্গায়িত গতিবিধি চীনা জনগণকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছিল। তখন এ উপহারের অন্য একটি তাত্পর্য চীনা জনগণের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তারা মনে করতে শুরু করে, এ স্বর্গীয় প্রাণীটি মহান চীন সম্রাটের সুশাসনের গুণে এবং তার ন্যায়পরায়ণ রাজ্য শাসনের স্বীকৃতি হিসেবেই মহাপ্রভুর কাছ থেকে প্রেরিত হয়েছে। চীনা পুরাণে এ রকম অদৃষ্টপূর্ব প্রাণীর আবির্ভাবের কথা নাকি উল্লিখিত আছে। সেই পুরাণের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হলো, এ অদ্ভুত সুন্দর ও আশ্চর্য প্রাণীর আবির্ভাব। পুরাণে উল্লিখিত হয়েছে, এ প্রতিশ্রুত জীবটির আবির্ভাব ঘটে শুধু রাজ্যের সবার মঙ্গলের জন্য। পুরাণে বলা হয়েছে, প্রাণীটি হবে শান্ত, তৃণভোজী ও অহিংস; যা চীনাদের বিবেচনা করতে হবে সুখ ও সমৃদ্ধির জীবন্ত প্রতীক হিসেবে।

চীনা সম্রাটকে উপহারটি পাঠিয়েছিলেন বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। তিনি এর আগেই চীন সম্রাটের দরবারে উপঢৌকনসহ দূত পাঠিয়েছেন এবং সম্রাট ইয়াং লোও প্রতি উত্তরে তার উপহারসমেত রাজদূতকে গৌড়ে পাঠিয়ে পাল্টা সম্মান জানিয়েছিলেন। বেশ কয়েকবার দুই দেশের মধ্যে সমুদ্রপথে জাহাজযোগে দূত বিনিময় হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলার সুলতান চীনা সম্রাটকে জিরাফ পাঠিয়ে ছিলেন তার রাজদূতের সঙ্গে। সুলতান জিরাফটি কোথা থেকে পেয়েছিলেন বা কীভাবে সংগ্রহ করেছেন, সে বৃত্তান্ত আমাদের জানা নেই। কারণ বাংলা-চীন দূত বিনিময়ের সঙ্গে এ আশ্চর্য উপহার পাঠানোর পুরো ঐতিহাসিক ঘটনাটি আমরা জানতে পেরেছি চীনা রাজদূতদের লেখা প্রতিবেদন থেকে। আর সম্রাটের কাছে পেশ করা প্রতিবেদনের সবার শেষে এ জিরাফের কথা উল্লেখ ছিল সংক্ষিপ্ত বর্ণনায়। চীনা মহাফেজখানায় পাওয়া এ প্রতিবেদন চীনা ভাষা থেকে অনুবাদ করেন প্রমোদ বাগচী, শান্তিনিকেতনে চীনা পণ্ডিতদের সহযোগিতায়।

সুলতানের দূত বিনিময় উদ্যোগ ছিল চীনের সঙ্গে সৌহার্দ জ্ঞাপন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ। চীন তখন পূর্বাঞ্চলের সব সমুদ্রের একচ্ছত্র অধিপতি। অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী রাজ্য জৌনপুরের সম্প্রসারণবাদী, আগ্রাসী মনোভাবের মোকাবেলা করার জন্য অন্য কোনো পরাক্রমশালী শক্তির সঙ্গে মৈত্রীবন্ধন স্থাপন বাংলার সুলতানের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। সেই বিবেচনায় চীনই ছিল সঠিক পছন্দ। কারণ চীন এক পরাক্রমশালী শক্তি হলেও তার পর রাজ্যের প্রতি কোনো লিপ্সা ছিল না এবং বাংলার সুলতানের ঘাড়ের ওপর তার নিঃশ্বাস ফেলারও কোনো উচ্চাশা ছিল না। পূর্বাঞ্চলের অফ্রিকায়ও তার কোনো অধিকৃত ভূখণ্ড বা নৌবহর ঘাঁটি নেই। সুতরাং চীনা নৌশক্তির কারণে বাংলার সুলতানের পূর্বদিকে তাকানোর নীতি যথাযথ হয়েছিল।

১৪০৪ থেকে ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ৩৪ বছর বাংলা-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন ছিল। ১৪৩৯ পর্যন্ত বাংলা থেকে প্রায় ১৩টি মিশন চীনে গিয়েছিল। চীনের প্রথম দূত বাংলায় হাজির হন ১৪০৯ সালে। তাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভোজে আপ্যায়িত করা হয়।

চীনা রাজদূত হু হিয়েন চীনা সম্রাটকে বাংলার সুলতানের দেয়া উপহার ও সেই ভোজের একটি ফিরিস্তি দিয়ে গেছেন:

‘আমাদের ভোজের শেষে প্রধান চীনা দূত, দূতদের রাজা (বাংলার সুলতান) সোনার শিরস্ত্রাণ, সোনার কোমরবন্ধ, সোনার গামলা, সোনার জলপাত্র আর সোনার বড় বাটি উপহার দিলেন। সহকারী দূতদের এই জিনিসগুলোই দেওয়া হলো, তবে সেগুলো রুপার তৈরি। নিম্ন কর্মচারীদের একটি করে সোনার ঘণ্টা আর রেশম ও সাদা শণের তৈরি জামা দেওয়া হলো। সৈন্যদের সবাইকে দেওয়া হলো রুপার টাকা। ধনী না হলে কি তারা এত উদারভাবে এসব দিতে পারত?’

—বঙ্গবৃত্তান্ত, অসীম রায়

এবার বাংলার সুলতানের চীনের সম্রাটের জন্য পাঠানো উপহারের তালিকার দিকে তাকানো যাক।

‘এতে ছিল সোনার-রুপার অলংকার, খোদাই করা সোনার সুদৃশ্য নানা সামগ্রী। চো-হাই-তালি কাপড় (সম্ভবত মসলিন), ঘোড়া, সোনা-রুপা বা অন্য ধাতুর তৈরি ঘোড়ার জিন, অস্বচ্ছ কাচের বাটি, শাল, পি-পু ও তুলোকিন বস্ত্র, দানাদার চিনি, ময়ূরের পালক, টিয়া পাখি, গন্ধদ্রব্য, খদির, এবোনি কাঠ, মাছরাঙার পালক, ঘি ইত্যাদি।’

—বঙ্গবৃত্তান্ত

১৪০৫ খ্রিস্টাব্দে চীনের সম্রাটের তরফ থেকে সুলতান গিয়াসউদ্দিনকেও উপহার পাঠানো হয়েছিল। তার মধ্যে ছিল চার রকমের চারটি করে চাদর আর চু-আলের আটটি চাদর সুলতানের জন্য। আর ওই রকমের তিনটি করে চাদর সুলতানার জন্য।

আগেই বলা হয়েছে, সুলতান গিয়াসউদ্দিন পূর্বদিকে তাকানোর নীতির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন এবং পাশাপাশি সমসময়ের মুসলিম বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাকে স্থাপন করারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

উপহার বিনিময়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে যে স্বচ্ছতা ও উদার বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিলেন গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ, তা তিনি মুসলিম বিশ্বের জন্যও প্রয়োগ করেছেন। তিনি মক্কা, মদিনা ও মিসরের শাসক এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। মক্কা ও মদিনার আধিবাসীদের জন্য তিনি দুটি মাদ্রাসা উপহার দেন। মাদ্রাসা দুটি পরিচালনার জন্য জমি ও ফলের বাগান কিনে দেন, যাতে এর আয় থেকে সারা বছরের খরচ উঠে আসে। শিক্ষকদের বেতন এ আয় থেকেই দেয়া হতো।

বাংলা থেকে সুলতানের দূত ইয়াকুবকে দিয়ে নগদ অর্থ ও নানা উপহার পাঠাতেন মক্কা-মদিনার আলেম ও প্রখ্যাত ব্যক্তিদের জন্য। মিসরের খলিফার সঙ্গে তিনি উপহার বিনিময় করে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। আর পারস্যের কবি হাফেজের সঙ্গে তার বিখ্যাত পত্রালাপ ও আমন্ত্রণের কথা অনেকেরই জানা।

অনেক সময় দেখা গেছে যে, অতি তুচ্ছ ও সামান্য বস্তুও উপহার হিসেবে ভীষণ চমকপ্রদ হতে পারে স্থান, কাল, পাত্রভেদে। এ রকম চমক সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক করিতকর্মা দূত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেই দূত স্যার জন মার্শাল। তিনি বিস্মিত করে দিয়েছিলেন পারস্যের বাদশা ফতেহ আলি শাহেক। জন মার্শাল রকমারি উপহারের মধ্যে বাদশাহকে উপহার হিসেবে দিলেন একটি আলু। বাদশাহ সামান্য সেই আলু দেখে আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। কারণ পারস্যের মানুষ এর আগে কখনো নাকি আলু চোখেও দেখেনি, খাওয়া তো দূরের কথা। সম্রাট তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কোমর থেকে তার নিজের খঞ্জরটি বের করে দিতে গিয়েও শেষ মহূর্তে থামেন, তখন নিজ খঞ্জর কোমরে ঢুকিয়ে কারিগরকে ডেকে পাঠালেন হুবহু তার রত্নখচিত খঞ্জরটির মতো আরেকটি খঞ্জর বানিয়ে দিতে। পারস্য সম্রাটের দেয়া উপহার সেই স্বর্ণ ও রত্নখচিত খঞ্জর আজো সাজানো রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে।

উপহার নিয়ে রয়েছে আরো অনেক চমকপ্রদ কাহিনী। বিশেষ করে ব্রিটিশ ভারতের বহু গুণী মানুষ ও ইংল্যান্ডের রাজপরিবারকে ঘিরে। মোগল সাম্রাজ্যের বিত্তবৈভব, বিশাল সৈন্যবাহিনী দুই বৃহৎ প্রতিবেশী পারস্য ও তুরস্কের সঙ্গে সমানে সমান টেক্কা দিয়ে চলতে সক্ষম ছিল। আশপাশের ছোট রাষ্ট্রগুলোও মহামতি মোগলদের সৌহার্দ কামনা করে মোগল দরবারে উপঢৌকনসহ দূত পাঠাত।

জাহাঙ্গীর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত সবারই দরবারে আসা বিভিন্ন দেশের দূতরা বাণিজ্য সুবিধার জন্য অথবা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নানা সময়ে ধরনা দিয়েছিলেন। মোগল দরবারির বিখ্যাত চিত্রকররা সেসব দূত ও তাদের আনা মণিমুক্তাসহ বিশাল উপঢৌকনের ছবি এঁকে রেখেছেন। সেই ছবিতে তাদের উপহার হিসেবে দেয়া তাজী ঘোড়া, বিশাল বলশালী উট ও বর্ণাঢ্য গালিচার ছবি শিল্পীর তুলিতে নিখুঁতভাবে আঁকা রয়েছে। মোগল বাদশারা দূতদের দরবারে হাজিরা নিয়ে বিশেষ আনন্দ পেতেন। এ দূতদের তিন-চার মাস অবস্থান না করে স্বদেশে ফিরে যেতে অনুমতি দিতেন না— এ রাজদূতরা যে তাদের দরবারের শোভা, গৌরব, তাদের ক্ষমতার একটা স্বীকৃতি— তাদের রেখে দেয়ার মধ্যেও এ উদ্দেশ্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে ইংল্যান্ডের রাজার কাছ থেকে চিঠি নিয়ে দূত হিসেবে এসেছিলেন স্যার টমাস রো। বিলেত থেকে পাঠানো উপঢৌকন রো সাহেব দরবারে নিয়ে আসতে সাহস পাননি। কারণ তার মনে হয়েছিল, ওই উপহারে বাদশাহ আদৌ খুশি হবেন না। শেষে তিনি বিলাত থেকে দুটি ঘোড়ায় টানা ছোট গাড়ি এনে জাহাঙ্গীরকে খুশি করতে পেরেছিলেন। জাহাঙ্গীর অবশ্য সেই গাড়ির গিনির কাজ ফেলে দিয়ে তার জন্য স্বর্ণ-রুপার পাত ব্যবহার করে গাড়ি দুটিকে আরো রাজকীয় রূপ দিয়েছিলেন। টমাস রো সে যাত্রায় দূতিয়ালিতে কোনো সাফল্য পাননি। তাকে খালি হাতে অর্থাৎ কোনো বাণিজ্য সুবিধার ফরমান না পেয়েই দেশে ফিরে যেতে হয়েছিল।

শাহজাহানের দরবারে পারস্যের রাজদূত অনেকদিন কাটিয়েছিলেন। তিনি সঙ্গে এনেছিলেন বিশাল রত্নরাজি, আববি ঘোড়া, ছোট হাতির আকারের উট, গালিচা ও সুগন্ধি আতর জল।

আওরঙ্গজেবের অভিষেকের সময় অনেক দেশের রাজদূত হাজির হয়েছিলেন তাদের সেরা উপহার নিয়ে। প্রথমেই এলেন উজবেক দূতরা। তাদের নিজ নিজ খানদের তরফ থেকে বাদশাহকে মোবারকবাদ জানাতে তারা এনেছিলেন কয়েক বাক্স অতি উত্কৃষ্ট লাপিজ লাজুলি পাথর বা নীল বৈদূর্য্য মণি। তাজমহলের কাজ শেষ হলেও তারা মনে করেছিলেন এসব পাথর তাজের অলঙ্করণে ব্যবহার হতে পারে। এছাড়া তারা এনেছিলেন কয়েকটি উন্নত জাতের তেজি তাতার ঘোড়া, উটের পিঠে বোঝাই নানা রকম ফল, আপেল, আঙ্গুর। বোখারা বা সমরখন্দ থেকে তখন ভারতে এ ফল আমদানি করা হতো।

বাদশাহ বিনিময়ে খানদের প্রত্যেককে দিলেন বিশেষভাবে স্বর্ণ-রুপার কাজ করা কাপড় এবং দুই খানের জন্য দুখানা মণিরত্নখচিত সুদৃশ্য রুমাল।

এরপর দরবারে হাজির হলেন মক্কার তত্ত্বাবধায়ক— সঙ্গে উপহার কয়েকটি উত্কৃষ্ট আরবি অশ্ব, স্বর্ণের মোহর, নানা রকম সুগন্ধি। মক্কার প্রতিনিধি সর্বশেষে সুদৃশ্য আবরণে ঢাকা একটি উপহার বের করলেন, দরবারে উপস্থিত সবাই উপহারটি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। উপহারটি একটি শুকনো খেজুর পাতার ঝাড়ু। মক্কাপ্রধান বিনীতভাবে জানলেন: এ ঝাড়ু দিয়ে পবিত্র কাবা গৃহের অভ্যন্তরে ঝাড়পোছ করা হয়েছে। সেজন্য এটি উপহারসামগ্রী রূপে মক্কাবাসীর কাছে অত্যন্ত সম্মানের ও মূল্যবান।

মক্কার পর হাজির হন ইরানের রাষ্ট্রদূত। তিনিও অনেকগুলো উত্কৃষ্ট ঘোড়া, সুদৃশ্য গালিচা এবং বহু মণিমাণিক্য উপহার হিসেবে এনেছেন। বাদশাহ খুব কৌতূহল নিয়ে সেসব উপহার নিজ হাতে তুলে নিয়ে দেখলেন এবং পারস্যের সম্রাটের বদান্যতার প্রশংসা করে দূতকে উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন।

সুরাটের ডাচ (ডাচ) কুঠির কর্তা মসিয়ে আন্দ্রেকাম বুদ্ধিমান শিক্ষিত দূত। তিনি সম্রাটকে নানা উপহারের মধ্যে একটি তখত-ই-রাওয়া দিয়েছিলেন। তখত অর্থ সিংহাসন আর রাওয়া মানে চলমান। সম্রাট এ উপহারে চমত্কৃত হয়েছিলেন কিন্তু ডাচ দূত কোনো বাণিজ্য চুক্তি হাতে পাননি।

এবার মোগল বাদশাহ ফররুখশিয়ারের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশাল এবং জাঁকালো উপঢৌকনের ইতিহাস বর্ণনা করা প্রাসঙ্গিক হবে। ১৬৯৮ সালে ইংরেজরা সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা এ তিনটি গ্রাম কিনে তাদের ব্যবসা শুরু করে, দিল্লির বাদশাহর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ফরমান ছাড়াই তারা বাংলার নবাবকে ইনাম দিয়ে ব্যবসা জারি রেখেছিল। নবাবকে প্রতি বছর এ ইনাম দেয়ার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য ১৭১৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানি জন স্যারমান ও এডোয়ার্ড স্টিফেনসনকে নিয়ে দুই সদস্যকে দূত হিসেবে নিয়োগ করে দিল্লির বাদশা ফররুখশিয়ারের কাছে সরাসরি পাঠিয়ে দেন। তাদের সঙ্গে ছিল দোভাষী হিসেবে আর্মেনিয়ান বণিক খোজা আরহন্দ ও চিকিৎসক হিসেবে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হ্যামিল্টন।

৩০ হাজার পাউন্ডের উপঢৌকন নিয়ে এ দূতরা দিল্লি দরবারে হাজির হন।

ইংরেজরা জানত বাদশাহর পরিণত বয়সেও খেলনার প্রতি আকর্ষণ রয়ে গেছে। সুতরাং তাদের আনা উপহারের ঝুড়িতে নানা ধরনের বিলেতি খেলনা ছিল। ছিল উত্কৃষ্ট দুরবিন, আতশ কাচ, পোরসেলিনের তৈজস, বেলজিয়াম কাচের আয়না— হাত আয়না। হাতির দাঁতের ওপর ইংরেজ শিল্পীর আঁকা মিনিয়েচার চিত্রকর্ম, আরো ছিল কারুকাজ করা সুন্দর দুটি পিস্তল, দুরবিনসহ দামি ব্রিটিশ ঘড়ি (আজকাল আমরা উত্কৃষ্ট ঘড়ি বলতে সুইস ঘড়িই বুঝি, কিন্তু সে আমলে বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি ছিল সুইস নয়, ইংরেজের তৈরি ঘড়ি, বিশেষ করে হাতঘড়ি। সত্যজিৎ রায়ের লেখা থেকে বিখ্যাত ব্রিটিশ ঘড়ি ‘পেরি গাল রিপিটার’-এর কৌলিন্যের কথা জানা যায় তার ফেলুদা সিরিজের বই গোরস্তানে সাবধান বই থেকে)। সম্রাটকে পাঠানো এ ঘড়ি নিয়ে ইংরেজদের উত্কণ্ঠার সীমা ছিল না। এ মূল্যবান ঘড়িগুলো পথে যাতে নষ্ট না হয় বা বিগড়ে গেলে যাতে তাত্ক্ষণিকভাবে মেরামত করা সম্ভব হয়, সে উদ্দেশ্যে দূতদের সঙ্গে একজন দক্ষ ঘড়ি মেরামতকারীকে দিল্লি পাঠানো হয়েছিল। কনসালটেশন নং ৮৩৪-এ এ-সংক্রান্ত কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়:

‘বাদশাহী ঘড়ি মেরামত

আমরা মোগল বাদশাহকে যে সমস্ত ঘড়ি উপহার দিব মনস্থ করিয়াছি, কলিকাতা হইতে আগরা যাইবার এই সুদীর্ঘ পথে সেগুলির কল খারাপ হইয়া যাইতে পারে, বা সেগুলি বন্ধ হইয়া যাইতে পারে। এই জন্য এই ঘড়িগুলির মেরামতি ও হেপাজতি কার্যের জন্য মি. গে উডকে নিযুক্ত করা হইল। গে উড সাহেব আগ্রায় উপস্থিত হইয়া ঘড়িগুলিকে একবার উত্তমরূপে মেরামত করিয়া দিলে উহা মোগল-বাদশাহকে উপহার দেওয়া হইবে। তিনি এই কার্যের জন্য মাসিক ৩০ টাকা বেতন পাইবেন। তাঁহার আবশ্যকীয় জিনিস পত্রাদি খরিদ করিবার জন্য আমরা তাহাকে পাঁচ মাসের বেতন অগ্রিম দিলাম।’

ইংরেজদের এ দৌত্যকর্মের প্রধান ব্যক্তিরা তাদের মিশনের বিবরণ রেখে গেছেন। ইতিহাসবিদ হরিসাধন মুখ্যেপাধ্যায় তার ‘কলিকাতা সেকালেরও একালের’ ইংরেজ দূতদের আনা কিছু উপহারসামগ্রীর কথা উল্লেখ করেছেন:

‘আমরা প্রথমবারে প্রয়োজনীয় উপহারগুলি লইয়া সম্রাট সাক্ষাতে গেলাম। এই উপহারের মধ্যে ১০০১ মোহর, টেবিলে রাখিবার উপযুক্ত মণিমুক্তাখচিত একটি বহুমূল্য ঘড়ি, সমগ্র ভূখণ্ডের একখানি মানচিত্র এবং আরও অনেক বহুমূল্য দ্রব্যাদি ছিল। এরূপ ধরনের জিনিসপত্র আমরা লইলাম যাহা দেখিলেই বাদশাহ আমাদের উপর সন্তুষ্ট হইবেন। আমরা এই সমস্ত নির্বাচিত উপহার দ্রব্যের এক একটি হাতে করিয়া সম্রাট দরবারে উপস্থিত হইলাম। উপহার দ্রব্য দৃষ্টে মহা সন্তুষ্ট হইয়া সম্রাট সার্মান সাহেবকে একপ্রস্থ বহুমূল্য পরিচ্ছদ ও মণিখচিত একটি কলগা উপহার দিলেন। খোজা সরহদের (দোভাষী) অদৃষ্টেও এইরূপ উপহার লাভ ঘটিল। সম্রাট আমাদের যথেষ্ট সমাদর করিলেন। দরবারান্তে আমরা ডেরায় ফিরিয়া আসিলাম। সেদিন উজীর সলাবৎ খার বাটিতেই আমাদের সকলের ভোজের নিমন্ত্রণ হইল।’

বাদশাহকে উপহার দেয়ার জন্য আরো একটি অভিনব সামগ্রী ইংরেজরা নির্মাণ করেন। এটি পৃথিবীর একটি মানচিত্র। স্বর্ণরঞ্জিত ও বিবিধ বর্ণে চিত্রিত সেই মানচিত্রটি বানানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন জন বরনেল।

উপহার পেয়ে সম্রাট ইংরেজদের যথেষ্ট সমাদর করলেও তাদের প্রার্থনা মঞ্জুরের কোনো লক্ষণ দেখালেন না। বাদশাহ এরই মধ্যে যোধপুরের রাজা অজিত সিংহের রূপসী কন্যার বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত। আর সম্রাটের দরবারেও ইংরেজদের পক্ষে-বিপক্ষে দুটো দল দাঁড়িয়ে গেল। ইংরেজরা হতাশ হয়ে কলকাতা ফিরে যাওয়ার মনস্থির করল। এমন সময় বাদশাহ কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হলেন। বাদশাহর খাস হাকিমদের চেষ্টায় তার কোনো আরোগ্য হলো না। পাত্রীপক্ষও তখন দিল্লিতে উপস্থিত। বাদশাহর বিয়ে নিয়ে একটা মহাবিশৃঙ্খলা দেখা দিল। ড. হ্যামিল্টন বাদশাহর কাছে তার চিকিৎসা করার সুযোগের জন্য আবেদন জানালেন। সম্রাট কোনো আপত্তি না করায় হ্যামিল্টনের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেন। গোটা দিল্লি শহর এ বিদেশী চিকিৎসকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলো।

হরিসাধনের বই থেকে জানা যায়:

‘রোগান্তে সম্রাট ফররুখশিয়ার প্রকাশ্য দরবারে ইংরেজ চিকিৎসক হ্যামিল্টনকে সম্মানিত করিলেন। তিনি তাকে একটি বহুমূল্য পরিচ্ছদ, মণিমুক্তাখচিত একটি কলগা, দুটি বহুমূল্য হীরকাঙ্গুরীয়, একটি হস্তী, একটি অশ্ব ও নগদ পাঁচ হাজার টাকা উপহার দিলেন। যে অস্ত্র সহায়ে তিনি সম্রাটের স্ফোটকের উপর অস্ত্রোপচার করিয়াছিলেন, সম্রাট সেই অস্ত্রগুলি সোনা দিয়া বাঁধাইয়া দিতে আদেশ দেন। এতদ্ব্যতীত তিনি তাঁহার কামিজে পরিবার জন্য এক সেট স্বর্ণনির্মিত, মণিখচিত বোতাম পর্যন্ত উপহার দেন। ডাক্তার সাহেবের চুল আঁচড়াইবার ব্যবস্থা করিতেও তিনি ভুলেন নাই। কারণ এই সঙ্গে হ্যামিল্টন সোনা দিয়া বাঁধানো মণিখচিত একটি বরুশ পর্যন্ত পাইয়াছিলেন।’

এবার সবার কলকাতা ফেরার পালা। সবাই বাদশাহর অনুমতি পেলেন কিন্তু সম্রাট কিছুতেই হ্যামিল্টনকে কাছছাড়া করবেন না। বহু অনুনয়-বিনয়ের পর হ্যামিল্টনের কলকাতা ফেরার অনুমতি মিলল। তবে শর্ত রইল যে, পরিবারের সঙ্গে দেখা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহের পর তিনি আবার দিল্লি ফিরে আসবেন। কিন্তু হ্যামিল্টনের আর ফেরা হলো না। তিনি পথেই মারা যান। মৃত্যুর আগে চিকিৎসক হ্যামিল্টন একটি উইল রচনা করেন, সেখানে তিনি বাদশার কাছ থেকে প্রাপ্ত উপহারসামগ্রীর বিলি ব্যবস্থা করে যান। উইলে তিনি উল্লেখ করেন:

‘আমি মি. সার্মানকে আমার ট্রাস্টি নিযুক্ত করিলাম। সম্রাট ফররুখশিয়ার আমাকে যে বহুমূল্য হীরকাঙ্গুরী ও মণিখচিত কলগাটি দিয়াছিলেন, তাহা আমি এই সার্মান সাহেবকে দান করিলাম।

ইহাই আমার শেষ উইল। সূর্যগড়ে, নদীবক্ষে বোটের উপর বসিয়া আমি এই উইল লিখিলাম। এখানে স্ট্যাম্প কাগজ পাওয়া যাইবে না বলিয়া সাদা কাগজেই উইল লেখা হইল।

সম্ভবত দিল্লী হইতে কলিকাতা প্রত্যাগমনের পথে নদীবক্ষে বসিয়া হ্যামিল্টন তাঁহার শেষ ইচ্ছাপত্র প্রস্তুত করেন। উল্লিখিত উইল হইতে জানা যায়, তিনি সম্রাটের নিকট হইতে যে সমস্ত বহুমূল্য অঙ্গুরীয়কাদি পাইয়াছিলেন, তাহার সবই বন্ধুবর্গের মধ্যে বিতরণ করিয়া যান।’

—‘কলিকাতা সেকালেরও একালের’

ইংরেজ দূতদের ইচ্ছা এরপর আর অপূর্ণ থাকেনি। বাদশাহ ফরমান মারফত তার সবই অনুমোদন করলেন। ইংরেজরা সুতানুটি, গোবিন্দপুর, কলকাতা তো পেলই, তার সঙ্গে পেল তাদের আর্জিমাফিক কলকাতাসংলগ্ন আরো ৩৮টি গ্রাম। সম্রাটদের সম্মানে এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ইংরেজ দূতরা কলকাতা বন্দরকে ফররুখবন্দর এবং নবলব্দ ৩৫টি গ্রামকে ‘ফররুখাবাদ’ নামে অভিহিত করতে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সম্রাট সবিনয়ে ইংরেজের এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

পূর্ব আলোচনার সূত্র ধরে এমন ধারণার জন্ম হওয়া স্বাভাবিক যে, একমাত্র নবাব ফৌজদার ও এদেশীয় পদস্থ কর্মকর্তারাই উপঢৌকন বা উৎকোচ গ্রহণে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এ দেশে কর্মরত বণিক সাহেবরা মুখে নৈতিকতার বুলি কপচালেও বাস্তবে তারাও উৎকোচ গ্রহণে পিছপা হতেন না। পলাশীর প্রহসনের পর যখন এ বিদেশীরা বাংলাদেশের হর্তাকর্তা হয়ে বসলেন, তখন সুযোগ বুঝে এ উৎকোচলোভীদের কুিসত-আসল রূপটি বেরিয়ে এল দিনের আলোয়। দেশীয় শাসনকর্তারা বিদেশীদের অনুগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে হয়ে উঠলেন উপঢৌকনদাতা আর বিদেশী বণিকরা পটপরিবর্তনের ফলে উপঢৌকনগ্রহীতা।

বাংলার নবাব সিরাজের পরিবর্তে মীরজাফরকে নবাব করার সময় আবার মীরজাফরের পরিবর্তে মীর কাশিমকে নবাব করার জন্য ইংরেজরা প্রচুর উৎকোচ নিয়েছিল। তারপর মীর কাশিমের বদলে আবার মীরজাফরকে ও ১৭৬৫ সালে মীরজাফরের মৃত্যুর পর তার পুত্র নীজমদৌলাকে নবাবের গদিতে বসানোর সময় আরেক দফা মোটা অংকের উপঢৌকন তথা উৎকোচ নিয়েছিল ইংরেজরা। যতবার নবাব পরিবর্তন হয়েছে, ততবারই ইংরেজদের পকেট ফুলেফেঁপে উঠেছে নগদ দক্ষিণার প্রাচুর্যে, যাকে বলা হতো নবারের উপহার বা উপঢৌকন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড় সাহেব থেকে শুরু করে মেজ সাহেব, সেজ সাহেব থেকে ছোট সাহেব পর্যন্ত সবার জন্যই উপযুক্ত নগদ অর্থ বরাদ্দ ছিল নবাবের পক্ষ থেকে। তার কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে দেয়া এ উপঢৌকনের পরিমাণ জানা যায় ইংরেজদের সরকারি কাগজপত্র ঘেঁটে।

এখানে শুধু কোম্পানির বড় ও মেজ সাহেবদের নবাব অদল-বদলের কারণে ইংরেজদের প্রাপ্তিযোগের আনন্দটা পেশ করা হলো।

সিরাজকে হটিয়ে মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসানোর সময় লর্ড ক্লাইভ দক্ষিণা পেয়েছিলেন নগদ ২ লাখ ১২ হাজার ৫০০ পাউন্ড, ওয়াটসন সাহেব ১১ হাজার ৭০০ পাউন্ড। আবার মীরজাফরকে সরিয়ে মীরকাশিমকে সিংহাসনে বসানোর সময় তদানীন্তন বড় সাহেব ড্যানসিটাট নিয়েছিলেন ৫৮ হাজার ৩৩৩ পাউন্ড, হলওয়েল ৩০ হাজার ৯৩৭ পাউন্ড। একইভাবে নীজমদৌলাকে নবাব বানাতে ক্লাইভ হাতে পেয়েছিলেন ৫৮ হাজার ৩৩৩ পাউন্ড, কার্নাক ৩২ হাজার ৬৬৩ পাউন্ড।

এত শুধু নবাব অদলবদলের প্রাপ্তিযোগ। এছাড়া জমিদারি বিলি ব্যবস্থার সময়ও সাহেবরা যথেষ্ট উৎকোচ পেতেন।

এ ধরনের ভাগ্যবান সাহেবরা দেশে ফিরে সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে নবাব নামে উপহাসিত হতেন। এছাড়া সে যুগের হাওয়া অনুযায়ী কোম্পানির রাইটার শ্রেণীর (করনিক শ্রেণী) কর্মচারীরা ঘুষের টাকায় একেকজন খুদে নবাব হয়ে উঠতেন। এর জন্যই বোধ হয় বলা হয়েছে, If Ecasar crosses the Rubicon, Mandarin crosses the gutter.

বাঙালি ধনকুবের এবং বিদ্বান ও সমাজ সংস্কারকরাও উনিশ শতকে ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে উপহার বিনিময় করেছিলেন। ভারতীয় সাম্রাজ্য থেকে আসা অভিজাত মানুষজনের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়ের শখ বরাবরই ছিল মহারানী ভিক্টোরিয়ার। তিনি জীবনভর ভারত থেকে আসা বুদ্ধিজীবী, সিংহাসনচ্যুত রাজপরিবার, রাজপরিবারের নারী সদস্যা— এদের সবারই দর্শন দিয়েছেন। ১৮৪২ সালের ১৬ জুন দ্বারকানাথ ঠাকুর উইন্ডসর ক্যাসেলে রানীর দর্শন পেলেন। সাক্ষাতের পর ভিক্টোরিয়া তার জার্নালে একটা ছবি এঁকেছিলেন। দ্বারকানাথের স্কেচ, সঙ্গে লেখা পরিচয়, Tagore, Zamindar. রানী ডায়েরিতে আরো যা লিখেছেন, ভারতীয় অতিথি তার হাতে চুমু খেলেন। তার পরনে ছিল জাতীয় পোশাক, স্বর্ণের সুতায় কাজ করা জামা, মাথায় পাগড়ি।

ভারতীয় বণিক দ্বারকানাথের সঙ্গে রানীর এই প্রথম সাক্ষাৎ। পরের পাঁচ মাসে দ্বারকানাথের সঙ্গে রানীর কয়েকবার দেখা হয়েছিল। রানী তার প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ দ্বারকানাথকে একটি মেডেল দিয়েছিলেন, তাতে রানীর ও প্রিন্স আলবার্টের ছবি আঁকা ছিল। দ্বারকানাথ বিলেতে ১৮৪৬-এর ৬ আগস্ট মারা যান। খোদ মহারানী ভিক্টোরিয়া একটি শববাহী ঘোড়ার গাড়ি পাঠিয়েছিলেন সেদিন অনুষ্ঠানে।

মহারানী ভিক্টোরিয়া কলকাতার ব্রাহ্মণ সমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনকে ১৮৭৬ সালের আগস্টে রাজপ্রাসাদে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। রানীর নিজের প্রাসাদকক্ষে দীর্ঘ সময় নিয়ে ভারতে স্ত্রী শিক্ষার পরিস্থিতি ও নেটিভ ম্যারেজ বিলের সম্পর্কে আলাপ করেছিলেন।

ভিক্টোরিয়া নিজে এ আলাপে সন্তুষ্ট হয়েছেন। কারণ তার কয়েক দিন পরই আবার ডেকে পাটিয়েছিলেন রানীর ক্যামেরায় তাদের যৌথ ফটো তোলার জন্য। কেশবচন্দ্র রানীকে দিয়েছিলেন নিজের স্ত্রীর একটি বড় তৈলচিত্র। বিনিময়ে রানী দুটি বই দিয়েছিলেন কেশব সেনকে। আর্লি ইয়র্স অব দ্য প্রিন্স কনসর্ট এবং হাইল্যান্ড জার্নাল, নিজ হাতে রানী লিখে দিয়েছিলেন টু বাবু কেশবচন্দ্র সেন, ফ্রম ভিক্টোরিয়া, সেপ্টেম্বর ১৮৭০। এ রকম আরো অনেক উপহারের গল্প এখানে-ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

এবার দুজন বিখ্যাত বাঙালির পাওয়া দুটি উপহার নিয়ে কিছু না বললে এ নিবন্ধ অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথের আর্জেন্টিনা ভ্রমণের সময় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো তাকে একটি আরামকেদারা উপহার দিয়েছিলেন। রাতে বিশ্রাম নিয়ে কবি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই চেয়ারটি জাহাজে কবির কেবিনে তুলতে গিয়ে দেখা গেল, দরজা দিয়ে সেটি ঢুকছে না। তখন দরজা কেটে চেয়ারটি কেবিনে প্রবেশ করানো হয়ে ছিল। কবি চেয়ারটিতে বসে কাজকর্ম করতে পছন্দ করতেন।

দ্বিতীয় উপহারটি হলো, একটি বিশালাকৃতির গ্রামোফোন। এইচএমভি কোম্পানি এটি দিয়েছিল কবি নজরুলকে ব্যবহারের জন্য। চুরুলিয়ায় নজরুলের পৈত্রিক বাড়িতে গ্রামোফোনটি রক্ষিত আছে। এ গ্রামোফোনটির সঙ্গে এইচএমভি তথা বাংলা আধুনিক গানের জন্মলগ্ন ও নজরুলের গভীর এবং অনন্য সাধারণ সৃষ্টিশীল সম্পর্কের প্রতীক হয়ে আছে এ গ্রামোফোন।

উপহার, উপঢৌকন, উৎকোচ মাঝখানের ভেদ রেখাটা বড় সূক্ষ্ম। উপহার আর উৎকোচের পার্থক্য বোঝাতে একটা সামান্য উদাহরণ হাজির করি: স্কুলের নিচু ক্লাসের মুখচোরা খুদে ছাত্রটি যখন ক্লাস শেষে একটি সাদা ফুল তার টিচারের হাতে দিয়ে লাজুক হেসে পালিয়ে যায়, এ উপহার কি কখনো উৎকোচ, নাকি এটি পৃথিবীর যেকোনো মানদণ্ডের নিরিখে সবচেয়ে খাঁটি উপহার? আপনারাই ভাবুন।

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close