সারাদেশ

টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড শারমিনের পদায়নেই ‘ঘাপলা’

ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে অনভিজ্ঞ এই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে * দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন কানুনগো সার্ভেয়ার * হয়রানির শিকার সাধারণ মানুষ

বার্তাবাহক ডেস্ক : টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড হিসেবে শারমিন আরার পদায়নেই ‘ঘাপলা’ রয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে মহানগরী এলাকায় (সিটি কর্পোরেশন) অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এসি ল্যান্ডের দায়িত্ব দেয়ার কথা। অথচ ৩১ বিসিএসের কর্মকর্তা শারমিন আরা গুরুত্বপূর্ণ এই সার্কেলে যোগদানের আগে এসি ল্যান্ড হিসেবে কোথাও কর্মরত ছিলেন না। অর্থাৎ প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা উপেক্ষা করেই তাকে টঙ্গী সার্কেলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসি ল্যান্ড হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন ফাইল সময়মতো নিষ্পত্তি করতে পারেন না শারমিন আরা। নানা অজুহাতে ফাইল নিষ্পত্তিতে তিনি কালক্ষেপণ করেন। অনেক ফাইল মাসের পর মাস অফিসে পড়ে থাকে। তার এই দুর্বলতার সুযোগ নেন অফিসের কানুনগো মোবারক উল্যা ও সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার। তারা সহকারী কমিশনারকে নানাভাবে প্রভাবিত করেন। ঘুষ না পেলে বিভিন্ন ফাইল থেকে কাগজপত্র সরিয়ে নেয়ার অভিযোগও রয়েছে অফিসের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। এমনকি মিস কেস নিষ্পত্তির পর সময়মতো রায়ের কপি পান না সংশ্লিষ্টরা। অফিস সহকারী আবদুর রাজ্জাককে ঘুষ না দিলে রায়ের কপি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এ কারণে সাধারণ মানুষের হয়রানি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা মহানগর এলাকার (সিটি কর্পোরেশন) সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) আন্তঃবিভাগীয় নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড হিসেবে কমপক্ষে এক বছর কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলে মহানগর এলাকায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড হিসেবে পদায়ন করা যাবে না।

টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ডের কার্যালয় এবং এর অধীনে তিনটি ভূমি অফিস গাজীপুর মহানগর এলাকার মধ্যে। প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই রাজস্ব সার্কেলের দায়িত্বে একজন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এসি ল্যান্ড থাকার কথা। এসি ল্যান্ড হিসেবে কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকলেও রহস্যজনকভাবে ২০১৭ সালের এপ্রিলে শারমিন আরা টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলে যোগ দেন। এর আগে তিনি বিভাগীয় কমিশনারের অফিসে কর্মরত ছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘এটা ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিষয়। ভূমি মন্ত্রণালয় যাকে নিয়োগ দেবে আমরা তাকেই নেব। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শারমিন আরার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠিয়েও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এর আগে মঙ্গলবার শারমিন আরা দাবি করেন, তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নন।

টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের এসি ল্যান্ড অফিসে মিস মোকদ্দমায় বাদী-বিবাদী পক্ষের একাধিক আইনজীবী জানান, এসি ল্যান্ড শারমিন আরা ভূমি সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে পারদর্শী নন। এ কারণে সাধারণ মিস মোকদ্দমা মাসের পর মাস চললেও নিষ্পত্তি হয় না। নানা অজুহাতে তিনি শুধু কালক্ষেপণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে মিস মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হলেও আদেশের কপি পেতে অনেক সময় লাগে। এসি ল্যান্ড অফিসের অফিস সহকারী আবদুর রাজ্জাক ঘুষ ছাড়া আদেশের কপি দেন না। আবার ঘুষ নিয়েও আদেশের কপি দিতে বিলম্ব করেন।

আইনজীবী মাহবুবুল আলম জানান, আহসান হাবীব নামে এক ব্যক্তির দায়ের করা ৫৫/১৭ নম্বর মিস মোকদ্দমায় তিনি বাদীর আইনজীবী ছিলেন। এই মামলায় বিবাদী পক্ষের কোনো আপত্তি ছিল না। এই সাধারণ মামলা নিষ্পত্তিতে তিনি এক বছরেরও বেশি সময়ক্ষেপণ করেছেন। এই মামলার রায় হয়েছে চলতি বছরের ৮ মার্চ। আদেশের কপি চাওয়া হয়েছে। অফিস সহকারী আবদুর রাজ্জাক মামলার কপি দিচ্ছেন না। টাইপিস্টসহ অফিস সংশ্লিষ্টদের খরচ (ঘুষ) দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও আদেশের কপি দেয়া হয়নি। আদেশের কপি সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে না যাওয়ায় ওই জমি মূল জোতে অন্তর্ভুক্ত করা যাচ্ছে না।

জানা গেছে, মিস মোকদ্দমা নম্বর ২৫/১৫ এবং ২৬/১৫ মামলার আদেশ হয়েছে ছয় মাস আগে। অথচ আদেশের কপি পাননি বাদীপক্ষ।

আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ১১৪/১৭ নম্বর মামলার বাদী হাবিবুর রহমান। এই মামলার বিবাদী বদির উদ্দিন গং। আমি বাদী পক্ষের আইনজীবী। ছয় মাসেরও বেশি আগে মামলাটি দায়ের করা হয়। অথচ এখনও মামলাটি শুনানি পর্যায়ে আছে। নিষ্পত্তিতে নানা অজুহাতে তিনি সময়ক্ষেপণ করছেন। ভূমি সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়ে এসি ল্যান্ড শারমিন আরার বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি এই মামলার নিষ্পত্তিতে সময় নিচ্ছেন।

আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন আরও জানান, তিনি দশজন ভুক্তভোগীর মামলার শুনানিতে অংশ নিচ্ছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার মনে হয়েছে, এসি ল্যান্ড শারমিন আরা ভূমি সংক্রান্ত আইনের বিষয়ে পারদর্শী নন।

এই আইনজীবী উল্লেখ করেন, মিস মামলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করা গেছে, নামজারি অনুমোদন করার পর আবার তিনিই (এসি ল্যান্ড) তার আদেশের বিপক্ষে খারিজ বাতিল করার রায়ও দিয়েছেন।

ঘুষ দিয়েও মিস মোকদ্দমার আদেশের কপি না দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অফিস সহকারী আবদুর রাজ্জাক বলেন, অভিযোগ ঠিক নয়। এতে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

এ সংক্রান্ত আরো জানতে….

টঙ্গী এসি-ল্যান্ড অফিসে দালালদের ‘রাজত্ব’

টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসে ‘জুয়াড়ি সিরাজের’ নেতৃত্বে সক্রিয় শক্তিশালী চক্র

সূত্র: যুগান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close