সারাদেশ

টঙ্গী এসি-ল্যান্ড অফিসে দালালদের ‘রাজত্ব’

ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না * এসি-ল্যান্ড শারমিন আরার ফাইল আনা-নেয়া করেন দালাল * গাছা ভূমি অফিসের রেজিস্টার এন্ট্রির কাজও করেন দালাল

 

বার্তাবাহক ডেস্ক : গাজীপুরের টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (এসি-ল্যান্ড) অফিসে দালালদের ‘রাজত্ব’ কায়েম হয়েছে। দালাল ছাড়া এ অফিসে কোনো কাজই হয় না।

টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের তিনটি ভূমি অফিসেও সাধারণ মানুষকে ভূমিসংক্রান্ত কাজে দালালদের শরণাপন্ন হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে এসি-ল্যান্ড শারমিন আরার ঘনিষ্ঠ তিন দালাল তিনটি ভূমি অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন।

তারা সকালে এসি-ল্যান্ড অফিসে আসেন। দুপুরের আগেই চলে যান নির্দিষ্ট ভূমি অফিসে। তাদের মধ্যে সিরাজুল ইসলাম নামে এক দালাল গাছা ভূমি অফিস নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি রেজিস্ট্রারও এন্ট্রি করেন। এসি-ল্যান্ড শারমিন আরার ফাইল আনা-নেয়ার কাজও করেন তিনি। অন্য দুই দালালের মধ্যে আলমগীর হোসেন কাশিমপুর ভূমি অফিস এবং দেলোয়ার হোসেন টঙ্গী ভূমি অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন। সরেজমিন অনুসন্ধান, এসি-ল্যান্ড অফিস সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

চিহ্নিত এ তিন দালালের বাইরে এসি ল্যান্ড অফিস এবং টঙ্গী সার্কেলের বিভিন্ন অফিসে আরও অন্তত ২০ জন দালাল সক্রিয় আছে। এরা সবাই এসি-ল্যান্ড অফিসের জারিকারক সিরাজুল ইসলাম ওরফে ‘জুয়াড়ি’ সিরাজের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সদস্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (এসি-ল্যান্ড) শারমিন আরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি টঙ্গী সার্কেলে যোগদান করার পরদিন থেকে অফিসের সব স্টাফকে আইডি কার্ড দিয়ে দিয়েছি। যাকে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে কে স্টাফ আর কে বাইরের লোক। তারপরও যেভাবে আমি অফিস সাজাতে চাই সেটা শতভাগ করতে পারিনি।’

ফাইল আনা-নেয়ার সঙ্গে দালাল জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, ‘আপনার এ অভিযোগ ঠিক নয়। দালাল দিয়ে রেজিস্টার এন্ট্রির বিষয়টি সঠিক নয়।’

এসি-ল্যান্ড অফিসে কাজ করেন এমন একজন দালাল বলেন, ‘দালাল সিরাজুল ইসলাম এসি-ল্যান্ড স্যারের খুবই ঘনিষ্ঠ। স্যারের খাবার পর্যন্ত এনে দেয় দালাল সিরাজ। স্যারের টেবিলের ফাইল আনা-নেয়ার কাজ করে সে। ঘুষ না দিলে ফাইল লুকিয়ে রাখে। পাঁচশ’ থেকে এক হাজার টাকা ঘুষ পেলে পেছনের ফাইল সামনে নিয়ে আসে। যখন তখন এসি-ল্যান্ডের কক্ষে প্রবেশের অনুমতি আছে সিরাজের। সে এসি-ল্যান্ডের খাস লোক।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দালাল সিরাজ এসি-ল্যান্ড শারমিন আরার ফাইল আনা-নেয়ার পাশাপাশি গাছা ভূমি অফিসের রেজিস্টার এন্ট্রি করেন। প্রতি এন্ট্রি থেকে তিনি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা ঘুষ নেন। জমির নামজারি থেকে শুরু করে ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের কন্ট্রাক্ট নেন তিনি। সব জায়গায় তিনি এসি-ল্যান্ড শারমিন আরার খাস লোক বলে পরিচয় দেন। এ অফিসে দালাল সিরাজের পাশাপাশি মজিবুর রহমান, আজগর, বাশার, মিজান ও সাইদুর নামে কয়েকজন দালাল সক্রিয় আছেন। তারা সিরাজের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন।

দালাল দিয়ে ভূমি অফিসের রেজিস্টার এন্ট্রি করার বিষয়ে গাছা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা আক্কাছ আলী বলেন, ‘আমার অফিসে কোনো দালাল নেই। দালাল দিয়ে রেজিস্টার এন্ট্রি করার বিষয়টি ঠিক নয়। কাজ করে দেয়ার বিনিময়ে ঘুষও নেই না।’ তবে এসি-ল্যান্ড অফিস সূত্র জানায়, আক্কাছ আলী তৃতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা হয়েও আক্কাছ আলী প্রাইভেটকার নিয়ে চলাফেরা করেন। উত্তরায় তার ফ্ল্যাট রয়েছে।

এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে দালাল সিরাজ বলেন, ‘আমি তেমন কিছু করি না। এসি-ল্যান্ড স্যারের (শারমিন আরা) নির্দেশে কিছু সাধারণ কাজ করি। গাছা অফিসের রেজিস্টার এন্ট্রি আমি করি না।’

এসি-ল্যান্ড অফিস সূত্র জানায়, কাশিমপুর ভূমি অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন এসি-ল্যান্ড শারমিন আরার ঘনিষ্ঠ দালাল আলমগীর হোসেন। তিনি প্রতিদিন সকাল ৮টায় এসি-ল্যান্ড অফিসে আসেন। সাড়ে ১০টার দিকে চলে যান কাশিমপুর ভূমি অফিসে। নামজারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজ করিয়ে দেয়ার নাম করে ওই অফিসে আসা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ আদায় করেন তিনি। দুপুরের পর ফাইল নিয়ে তিনি এসি-ল্যান্ডের অফিসে যান। দালাল আলমগীর এসি-ল্যান্ড অফিসের অফিস সহকারী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ। এ অফিসে তার সহযোগী হিসেবে আল-আমিন, রুবেল, আজহারুল ইসলাম, স্বপন, রফিক ও আজাদ নামে আরও কয়েকজন দালাল সক্রিয় রয়েছেন।

জানতে চাইলে কাশিমপুর ভূমি অফিসের কর্মকর্তা আক্তার হোসেন বলেন, ‘আমার অফিসে কোনো দালাল নেই। আমার অফিসে কোনো অনিয়মও হয় না।’

অভিযোগের বিষয়ে দালাল আলমগীর বলেন, ‘আমি এসি-ল্যান্ড অফিসে যাই। কখনও কখনও কাশিপুরেও যাই। তবে আমি কারও সঙ্গে কন্ট্রাক্ট করি না।’

জানা যায়, টঙ্গী ভূমি অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন এসি-ল্যান্ড শারমিন আরার ঘনিষ্ঠ দালাল দেলোয়ার হোসেন। দেলোয়ারের ইশারা ছাড়া সেখানে কোনো কাজ হয় না। ওই অফিসে দেলোয়ারের সহযোগী হিসেবে আল-আমিন ও হুমায়ুন সক্রিয় রয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টঙ্গী ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এসএম মান্নান বলেন, ‘এই অফিসে কোনো দালাল নেই। এই অফিসে ঘুষ-দুর্নীতিও নেই।’

এ বিষয়ে দালাল দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিক নয়। এ ধরনের অভিযোগের কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবেন না।’

সরেজমিন কাশিমপুর ভূমি অফিসের পাশে একটি চায়ের দোকানে কথা হয় এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমি ৬ মাস আগে ১০ শতাংশ জমি নামজারির আবেদন করি। কয়েক দিন পর কাশিমপুর ভূমি অফিসে গেলে একজন উপ-সহকারী কর্মকর্তা জানান, সরেজমিন যেতে হবে। দুই মাস পরও সরেজমিন তিনি যাননি। দুই মাস পর খোঁজ নিতে গেলে ভূমি অফিস থেকে জানানো হয়- ভলিউমে জমি নেই, কাগজপত্রেও মিল নেই। তাই নামজারি হবে না। পরে এক দালালের কাছে গেলে ওই দালাল বিভিন্ন টেবিলের কথা বলে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। বিভিন্ন বিষয় চিন্তা করে তাকে টাকা দিতে রাজি হই। টাকা দিলে দেড় মাসের মধ্যেই নামজারি হয়ে যায়।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, কাশিমপুর এলাকার ছোট গোবিন্দপুর মৌজার মিজানুর রহমান, সারাব মৌজার সালমা আক্তার, সারাব মৌজার জাহাঙ্গীর আলম, জুলফিকার নামে চার ব্যক্তি নামজারির জন্য দুই মাস আগে এক দালালকে প্রথমে ২৫ হাজার টাকা দেন। কিন্তু কাজ না হওয়ায় আরেক দালালের মাধ্যমে তারা এসি-ল্যান্ড অফিসে যান। পরে ওই নথি তারা খুঁজে পান এসি-ল্যান্ড অফিসের সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তারের টেবিলে। সাত্তার ১৫ হাজার টাকা নিয়ে নামজারি করে দেন। তবে আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমি কারও কাছ থেকে কোনো ঘুষ নেই না।’

 

 

এ সংক্রান্ত আরো জানতে….

টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসে ‘জুয়াড়ি সিরাজের’ নেতৃত্বে সক্রিয় শক্তিশালী চক্র

 

সূত্র: যুগান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close