সারাদেশ

টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসে ‘জুয়াড়ি সিরাজের’ নেতৃত্বে সক্রিয় শক্তিশালী চক্র

সবকিছু দেখেও নীরব এসি ল্যান্ড শারমিন আরা * চক্রে আছেন কানুনগো, সার্ভেয়ার এবং ২ অফিস সহকারী * একেক ফাইলের জন্য ঘুষের রেট একেক রকম

বার্তাবাহক ডেস্ক : গাজীপুরের টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) অফিসের মূল নিয়ন্ত্রক এক জুয়াড়ি। তার নাম সিরাজুল ইসলাম। তিনি টঙ্গীর এসি ল্যান্ড অফিসে জারিকারক হিসেবে কর্মরত আছেন। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও টঙ্গীর তিনটি ভূমি অফিসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন এই ব্যক্তি।

সব ঘুষ-দুর্নীতির মূলে রয়েছেন এই ‘জুয়াড়ি সিরাজ’। তার মূল পোস্টিং কালীগঞ্জের এসি ল্যান্ড অফিসে। অথচ ক্ষমতার দাপটে ২০১৪ সাল থেকে তিনি টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসে সংযুক্ত রয়েছেন। তার নেতৃত্বে এসি ল্যান্ড অফিসে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়।

এ সিন্ডিকেটে রয়েছেন এসি ল্যান্ড অফিসের কানুনগো মোবারক উল্যা, সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার, অফিস সহকারী আবদুর রাজ্জাক ও নজরুল ইসলাম। সরেজমিন ঘুরে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিস এবং নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। ঘুষ না দিলে জমি সংক্রান্ত কোনো ফাইল এসি ল্যান্ডের টেবিলে যায় না। বিভিন্ন ফাইলের জন্য আলাদা আলাদা ঘুষের রেট নির্ধারণ করা আছে। দালালদের মাধ্যমে ঘুষের টাকা নেন ওমেদাররা। এসি ল্যান্ড অফিসের অফিস সহকারী নজরুল ইসলাম গাছা ও কাশিমপুর ভূমি অফিস নিয়ন্ত্রণ করেন। অপরদিকে টঙ্গী ভূমি অফিসের ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করেন আবদুর রাজ্জাক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) শারমিন আরা এসব দেখেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন। তার টেবিলে ফাইল আনা-নেয়ার কাজ করছেন সিরাজ নামে এক ওমেদার। এ অবস্থার জন্য ভুক্তভোগীরাও এসি ল্যান্ডকে দায়ী করেন। তাদের মতে, অন্যায় হচ্ছে, কিন্তু তিনি দেখেও না দেখার ভান করছেন। অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত বলেই তিনি এমনটা করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন আরা বলেন, ‘সাধারণত সব ভূমি অফিস নিয়েই অনেক অভিযোগ থাকে। আমি টঙ্গীতে যোগদান করার পর থেকে এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে এনেছি। এখন আমার অফিস অনেকটাই দুর্নীতিমুক্ত। কারও বিরুদ্ধে কোনো ধরনের স্পেসেফিক অভিযোগ থাকলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

ঘুষ না দিলে ফাইল এসি ল্যান্ডের টেবিলে যায় না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ ঠিক নয়। যারা আপনার কাছে অভিযোগ করেছে, তারা আমার কাছে কোনো ধরনের অভিযোগ দেননি। ওমেদার দিয়ে ফাইল আনা-নেয়ার বিষয়টি ঠিক না।’

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসের নিয়ন্ত্রণাধীন টঙ্গী ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা এসএম মান্নান, কাশিমপুর ভূমি অফিসের কর্মকর্তা আক্তার হোসেন এবং গাছা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা আক্কাছ আলী ঘুষ-দুর্নীতিতে বেপরোয়া। তিন অফিসেই ওমেদার বা দালালরা ঘুষের টাকা নেন। তাদের মধ্যে এসএম মান্নানকে গাছা ইউনিয়ন অফিসে কর্মরত থাকাকালীন ২০০৭ সালে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। ঘুষ-দুর্নীতিতে পারদর্শী হওয়ায় তাদের ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেয়া হয়েছে বলে অনেকে জানান। তবে তিনজনই তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টঙ্গী ভূমি অফিসের কর্মকর্তা এসএম মান্নান বলেন, আমার অফিসে কোনো ওমেদার নেই। আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন। কাশিমপুর ভূমি অফিসের কর্মকর্তা আক্তার হোসেন ও গাছা ভূমি অফিসের কর্মকর্তা আক্কাছ আলী বলেন, ‘আমরা কখনোই ঘুষ নিয়ে কাজ করি না। আমাদের অফিসে কোনো ফাইলও পড়ে থাকে না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে জেলা প্রশাসন চত্বরের কর্মচারীদের রিক্রিয়েশন ক্লাবে একজন ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে গিয়ে চারজন জুয়াড়িকে হাতেনাতে আটক করেন। তখন ওই ক্লাবের সভাপতি ছিলেন জারিকারক সিরাজুল ইসলাম। জেলা প্রশাসন ঘটনার তদন্ত করে সিরাজের সংশ্লিষ্টতা পায়। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল তদন্ত প্রতিবেদনে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখনও তার নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে জুয়ার আসর বসে। তদন্ত প্রতিবেদনের একটি কপি আমাদের হাতে রয়েছে।

এই সিরাজ ২০১৪ সালে টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিস উদ্বোধনের শুরু থেকেই কর্মরত আছেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি বছরের পর বছর টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসে বহাল তবিয়তে আছেন। অথচ তার মূল পোস্টিং কালীগঞ্জ এসি-ল্যান্ড অফিসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জারিকারক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রিক্রিয়েশন ক্লাবে অভিযানটি ছিল ভুল বোঝাবুঝি। পরে সেটি মীমাংসা হয়েছে। কোনো ধরনের জুয়ার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আর এসি ল্যান্ড অফিসে কোনো ধরনের ঘুষ-দুর্নীতি হয় না। এগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

ভুক্তভোগীরা জানান, টঙ্গীর এসি ল্যান্ড অফিস এবং এসি ল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকা তিনটি ভূমি অফিসে ঘুষেরও রেট নির্ধারণ করা আছে। ‘খ’ তফসিলের জমির নামজারির ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশের কম হলে ঘুষের রেট ৮ হাজার টাকা। অপরদিকে সাধারণ খারিজের ক্ষেত্রে ঘুষের হার এক হাজার টাকা। তবে জমির পরিমাণ ৩৫ শতাংশের বেশি হলে ঘুষের হার নির্দিষ্ট থাকে না। তখন তা আলোচনা করে নির্ধারণ করা হয়। সমবায় সমিতির নামজারি, শিল্পকারখানার নামজারি, হাউজিংয়ের নামজারির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো রেট নেই। এক্ষেত্রে আলোচনা সাপেক্ষে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে নামজারি করা হয়।

কাশিমপুরের অধিবাসী মাইনউদ্দিন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, তার জমির সীমানা নির্ধারণের জন্য পাঁচ মাস আগে এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করেছিলেন। কাশিমপুর ভূমি অফিস থেকে নামজারির জন্য প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল। এসি ল্যান্ড অফিসের সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার তার কাছে নামজারির জন্য দুই হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। এই টাকা না দেয়ায় নামজারির আবেদন বাতিল করে দেয়া হয়।

নাসিমা আক্তার নামে এক ভুক্তভোগী জানান, জানুয়ারিতে ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি আদালত কর্তৃক অবমুক্ত করার পর তিনি নামজারির জন্য আবেদন করলে কাশিমপুর ভূমি অফিস তা এসি ল্যান্ডের অফিসে পাঠিয়ে নামজারির জন্য পাঠায়। এসি ল্যান্ড অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘুষের টাকার দরকষাকষিতে না মেলায় আবেদনটি বাতিল করে দেয়া হয়।

টঙ্গী এসি ল্যান্ড অফিসের কানুনগো মোবারক উল্যার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সার্ভেয়ার আবদুস সাত্তার বলেন, আমি কোনো ধরনের ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অফিস সহকারী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি কোনো অফিস নিয়ন্ত্রণ করি না।’

অফিস সহকারী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কোনো অফিস নিয়ন্ত্রণ করি না। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’

সূত্র: যুগান্তর

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close