আলোচিত

সুফল মিলেছে সামাজিক বনায়নে

আলোচিত বার্তা : জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বিকল্প নেই বনায়নের। আর সমাজের অসচ্ছল অংশের মানুষের কাছে অর্থসহায়তার বিকল্প নেই। এ দুই অবিকল্পের সংযোগে সুফল মিলছে সামাজিক বনায়নে। চট্টগ্রাম জেলায় গত নয় বছরে ১৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও উপকূলীয় বন বিভাগ। এ সামাজিক বনায়নের ফলে উপকারভোগীদের প্রায় ২১ কোটি টাকা লভ্যাংশ দিয়েছে চট্টগ্রামের তিন বন বিভাগ। অর্থপ্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের আগ্রহ বেড়েছে সামাজিক বনায়নে।

চট্টগ্রাম বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও উপকূলীয় বন বিভাগ সামাজিক বনায়নে উপকারভোগীদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২১ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি বিতরণ করেছে। যার মধ্যে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ ১৩ কোটি ১০ লাখ ৫০ হাজার ৭৮৬ টাকা, দক্ষিণ বন বিভাগ ৭ কোটি ৫৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৬৫ টাকা এবং উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রাম রেঞ্জ প্রায় ১ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। এ সময়ে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে ১৭ হাজার, দক্ষিণ বন বিভাগে ১০ হাজার ৩০০ জন এবং উপকূলীয় বন বিভাগে ৭৭ জন উপকারভোগী আর্থিক সুবিধা পেয়েছে।

সামাজিক বনায়ন বিধিমালা-২০০৪-এর ২০ ধারা অনুযায়ী, বন বিভাগের উপকারভোগীরা গাছ বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থের ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ পেয়ে থাকে। বাকি ১০ শতাংশ অর্থ দিয়ে আবার বনায়ন করা হয়। বন বিভাগের জমির বাইরে অন্যত্র বাগান করা হলে সেক্ষেত্রে উপকারভোগী পায় অর্থের ৪৫ শতাংশ, জমির মালিক ২০ শতাংশ, বন বিভাগ ২০ শতাংশ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউনিয়ন বা করপোরেশন পায় ৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ অর্থে পরবর্তীতে বনায়ন করা হয়। সাধারণত এসব বনের মেয়াদ হয় ১০ বছর। লাগানো হয় আকাশমনি, মেহগনি, কদম, কাঞ্চন, জাম, আমলকী, হরীতকীসহ বিভিন্ন ওষধি, বনজ ও ভেষজ গাছের দ্রুত বর্ধনশীল চারা।

গত ৯ অর্থবছরে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে বাগানের উপকারভোগীরা পেয়েছে ৬ কোটি ৬০ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা হয়েছে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, ভূমির মালিক পেয়েছেন ৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পরিষদ পেয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকার বেশি। এদিকে দক্ষিণ বন বিভাগে উপকারভোগী পেয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা দেয়া হয়েছে ৪ কোটি টাকার বেশি, বৃক্ষরোপণ তহবিলে ৭২ লাখ টাকার বেশি জমা দিয়েছে বন বিভাগ। তবে এ অঞ্চলে সামাজিক বনায়নের কিছু প্রকল্প এখনো শেষ না হওয়ায় অনেক উপকারভোগীর হাতে টাকা দেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. বখতিয়ার নূর সিদ্দিকি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বনায়নের কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে সরকার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রকল্পগুলো চলমান থাকায় সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকছে। সামাজিক বনায়নে একটি মেয়াদ ধরা হয়। মেয়াদ শেষ হলে গাছগুলো বিক্রি করে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা-২০০৪ অনুযায়ী ৪৫ শতাংশ টাকা উপকারভোগীদের দেয়া হয়। বাকি টাকা আইনানুযায়ী বিতরণ করে থাকি। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগসহ অন্যান্য বন বিভাগ মেয়াদ শেষে লক্ষ্যমাত্রার বেশি টাকা উপকারভোগীদের দিয়েছে। তাছাড়া অনেকগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। সেগুলো থেকে অর্জিত লভ্যাংশ আগামীতে উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করব।

বিধিমালা অনুযায়ী, যেখানে বনায়ন করা হয়, তার আশপাশের এক থেকে দুই কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকারভোগী নির্বাচিত হয়ে থাকে। বনের গাছপালা পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণ উপকারভোগীর কাজ। বন বিভাগের কমিটি উপকারভোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করে।

ফটিকছড়ি উপজেলার উপকারভোগী সৈয়দা সামসুন্নাহার বলেন, ‘আমি ২০১৬ সালে সামাজিক বনায়নের একজন উপকারভোগী ছিলাম। আমি ও আমার স্বামী ১ লাখ ১৬ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। এখানে যে গাছ ছিল, সেগুলো প্রায় ১০ বছরের বেশি রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলাম। পরে স্থানীয় বন কর্মকর্তা আমাদের জানালেন, আমরা এ টাকা পাব। আমরা অনেক খুশি। আমাদের মতো অনেকেই এখানে অনেক টাকা পেয়েছে।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত মোট পাঁচ বছরে এনরিচমেন্ট (এএনআরসহ) বাগান করা হবে ৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে, পাহাড়ি বাগান হবে ৭৫০ হেক্টর, জ্বালানি বন বাগান হবে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর, সেগুন বাগান হবে ২ হাজার হেক্টর, বাফার জোন বাগান হবে ৫ হাজার হেক্টর, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার এমন স্থানে সামাজিক বনায়ন হবে ২ হাজার ৩২০ হেক্টরে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সোয়া তিন লাখ চারা লাগানো হচ্ছে এবং বিক্রয় বা বিতরণের উদ্দেশ্যে চারা উৎপাদন করা হবে প্রায় ৩২ লাখ। এছাড়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের উদ্যোগে প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্ট্রিপ বাগানের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় বন বিভাগ উপকূলে ১ হাজার ৩০ হেক্টর জমিতে ম্যানগ্রোভ বাগান এবং ৫০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানের (সিডলিং) কাজ করবে বলে সূত্র জানিয়েছে।

 

 

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close