আলোচিতজাতীয়

মাদকবিরোধী অভিযান ফের চাঙা, বাড়ছে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা

আলোচিত বার্তা : কক্সবাজারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনার পর মাদকবিরোধী অভিযান অনেকটা স্তিমিত হলেও গত কয়েকদিনে আবার যেন পুরোদমে শুরু হয়েছে। আবারও বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি বড় মাত্রায় মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয় ১৪ মে থেকে। শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একদিনে ১২ জন নিহত হওয়ারও রেকর্ড আছে। আর শুরুর পর এক মাসে মোট নিহত হন ১৫০ জন।

২৭ মে রাতে আটকের কয়েক ঘণ্টা পর কক্সবাজারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর এবং সাবেক যুবলীগ নেতা একরামুল হক গুলিতে নিহত হন। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা একরামুলকে ধরে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। স্থানীয় থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ ছিল না। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে একরামুলের স্ত্রী ‘ক্রসফয়ারের’ একটি টেলিফোন রেকর্ডের অডিও প্রকাশ করেন, যা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হলে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয় একরামের পরিবার এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা একরাম ‘হত্যার’ বিচার দাবি করেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাস মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে এ অভিযান বন্ধের দাবি জানায়। এরপর জুন মাসে মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার ঘটনা কমে যায়। কমতে কমতে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। জুন মাসে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার সংখ্যা কমে আসার পিছনে ঈদুল ফিতরও একটি কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

তবে গত কয়েকদিনে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় এক-দুইজন করে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছিলো। বুধবার দেশের চার জেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কেরানিগঞ্জ, কুষ্টিয়া, লক্ষ্মীপুর ও নাটোরে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ওই পাঁচজন নিহত হন৷ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, নিহত সবাই চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা।

মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে প্রায় দুই মাস। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসেবে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৮৮ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম একমাসেই নিহত হয়েছেন ১৫০ জন। আর এই অভিযানে নামের মিল থাকায় ভুল মানুষ, দাবিকৃত টাকা না পেয়ে, রাজনৈতিক কারণে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার অভিযোগ আছে।

কিন্তু এসব অভিযোগে এখনো কোনো মামলা হয়নি। আর সাধারণভাবে কোনো পরিবারের মামলা করার সুযোগও নেই। কারণ, প্রতিটি ঘটনায়ই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বাদী হয়ে মামলা করেছে।

কক্সবাজারের ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা করেছে র‌্যাব।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রনজিত কুমার বড়ুয়া জানান, ‘‘মোট তিনটি মামলা হয়েছে। একটি র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, একটি অস্ত্র আইনে এবং তৃতীয়টি মাদক আইনে। প্রথম মামলায় নিহত হওয়ার ৩০২ ধারাও আছে।

মামলায় বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার পর বন্দুকযদ্ধে একরাম নিহত ও সহযোগীরা পালিয়ে যান৷।ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র এবং গুলি উদ্ধার দেখানো হয়েছে দ্বিতীয় মামলায়। আর মাদক আইনের মামলায় মাদক দ্রব্য উদ্ধার দেখানো হয়েছে।”

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘একরামের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ করা হয়নি। আমরা মামলাটির তদন্ত করছি।”

এদিকে বুধবার একরামের স্ত্রী’র সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়৷ পরিবারের অন্য দুই সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা মামলা নিয়ে কোনো কথা বলতে চাননি। জানা গেছে, একরামের স্ত্রী এখন তাঁর মোবাইল ফোনটি আর অন করেন না। আর অধিকাংশ সময় তিনি তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রামে থাকেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘এইসব ঘটনায় মামলা হয়। আর মামলা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফলে এইসব মামলার তদন্তে প্রকৃত ঘটনা জানা যায় না। আর তদন্ত যা হয়, তা নির্বাহী তদন্ত। ওই তদন্তও তেমন কাজে আসে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মামলা করলেও যে-কেউ এখানে পার্টি হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবেশ নেই।”

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমি মানবাধিকার কশিমনের চেয়ারম্যান থাকাকালে বেশ কয়েকটি ঘটনার তদন্ত স্বাধীনভাবে করেছিল কমিশন। তাতে কয়েকটি ঘটনায় ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের সত্যতা পাওয়া যায়নি। আমরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করেছিলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদরদপ্তরে। তার দু-একটি ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে মনে পড়ে। অধিকাংশ ঘটনায়ই মামলা হয়নি।”

তিনি আরো বলেন, ‘‘একরামকে হত্যার পর অভিযান তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। যারা এই কাজে যুক্ত ছিলেন, তারা সতর্ক হয়ে যান। ফলে আমরা দেখি, বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা কমতে থাকে। কিন্তু তাদের এই ধীরে চলো নীতি ছিল কিছু দিনের জন্য। তারা আবার আগের মতোই শুরু করেছে। অভিযানের নামে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা আবার বাড়ছে। কমেযাওয়ায় আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমরা আবার উদ্বিগ্ন।”

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক, মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘‘বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের অনেক ঘটনা যে হত্যাকাণ্ড তা প্রমানের জন্য যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ আমাদের কাছে আছে, মানুষের কাছে, সাংবাদিকদের কাছে আছে। কিন্তু যে ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে ওইসব সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে মানুষ কথা বলতে সাহস পাচ্ছে না। কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে থামিয়ে দেয়া হয়। পুলিশ এইসব মামলায় যে প্রতিবেদনই দিক না কেন, তাতে নারাজি দিয়ে বা অধিকতর তদন্তের আবেদন করা যায় আদালতে। কিন্তু সেটার জন্য পরিবেশ পরিস্থিতির প্রয়োজন। আর একবার মামলা হলে থানায় ওই ঘটনায় আরেকটি মামলা করা সুযোগ থাকে না।”

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘একরাম হত্যার অডিও ক্লিপ প্রকাশের পর মানুষ চরম বেদনা অনুভব করে। তাঁরা স্বজন হারানোর কষ্ট অনুভব করে। তাই কিছুদিন বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ রেখেছিল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এখন আবার শুরু করেছে। তারা এর মাধ্যমে দেশে এক ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখতে চায়, যাতে কোনো প্রতিবাদ বা আন্দোলন হতে না পারে।”

 

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close