খেলাধুলা

দুনিয়া কাঁপাতে ‘ফুটবল যুদ্ধে’ জমা আবেগ, উত্তেজনা, রোমাঞ্চের গোলা-বারুদ

খেলাধুলা ডেস্ক : ততদিনে ব্রিটিশ শাসিত দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবল। দুই দলে ভাগ হয়ে ম্যাচ আয়োজন করা হলেও দুই দেশের মুখোমুখি লড়াইয়ের নজির অবশ্য ছিল না। ১৮৭২ সালে গ্লাসগোর স্কটল্যান্ড-ইংল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে সেই দৃশ্যটা দেখা হয়ে যায়, ফুটবল ইতিহাসে সেটাই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

ক্রীড়াপ্রেমী ব্রিটিশরা নিজেদের উপনিবেশের মধ্যে টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ধীরে ধীরে বিকশিত করে ফুটবলকে। এরপর অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে দেখভালের জন্য ফিফার জন্ম এবং একটা সময় নিজেদের পায়ে হেঁটে চলার সামর্থ্যের মাধ্যমে তরতরিয়ে এগিয়ে চলা আন্তর্জাতিক ফুটবলের।

মাঝে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন পথ। ১৯০৪ সালে জন্ম নেওয়ার পর থেকে ফিফা দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট আয়োজনের চেষ্টা করেও সফল হয়নি। পরে অলিম্পিকের সঙ্গে মিলে গড়ে প্রাথমিক ভিত। যে ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৩০ সালে ‘নিজের পায়ে’ হাঁটা শুরু ফিফার। ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার তখনকার সভাপতি জুলে রিমে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হয় উরুগুয়ের বুকে হওয়া ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপে। ১৯৩০ সালে যাত্রা শুরু করা ফুটবলের সেই উত্তেজনা ও আবেগে বোঝাই ট্রেন এখন পৌঁছেছে রাশিয়ার স্টেশনে।

যে ট্রেনে চড়তে প্রস্তুত গোটা বিশ্ব। ৩২ দিনের সফরে রাশিয়ার ১১ শহরের ১২ স্টেশন (পড়ুন স্টেডিয়াম) ঘুরে বেড়াবে বিশ্বকাপ ট্রেন। সেখানে ফুটবলপ্রেমীদের রোমাঞ্চকর সব মুহূর্ত দিয়ে মুগ্ধ করবেন ৩২ দেশের ৭৩৬ খেলোয়াড়। ১৪ জুন মস্কোতে শুরু হওয়া এই সফর শেষ হবে ১৫ জুলাই একই স্টেশনে পর্দা নামিয়ে।

অনেক খেলারই বিশ্বকাপ আছে। ক্রিকেট, রাগবি, হকি, বেসবল, এমনকি দাবারও বিশ্বকাপ আছে। তবে শুধু বিশ্বকাপ বললে ফুটবলটাই সামনে আসে সবার। কারণ আর কোনও বিশ্বকাপ নিয়ে এতটা আগ্রহ নেই বিশ্বের। ফুটবল মানে আবেগের জোয়ার, ফুটবল মানে উত্তেজনার ঢেউ, ফুটবল মানে রোমাঞ্চকর প্রতিটি মুহূর্ত। আর কোনও বিশ্বকাপে আছে এমন উপাদান?

উত্তেজনা-রোমাঞ্চের ডালি সাজিয়ে আবারও হাজির বিশ্বকাপ। ফুটবল মহাযজ্ঞের ২১তম আসরের পর্দা উঠছে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) রাত ৯টায় স্বাগতিক রাশিয়া ও সৌদি আরবের ম্যাচ দিয়ে। ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে গড়া লোভনীয় ট্রফি জয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে ৩২ দল। যেখানে বাছাই পর্বের কঠিন বাধা পেরিয়ে মূল পর্বে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে আইসল্যান্ড ও পানামা।

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে নামছে জার্মানি। ২০১৪ বিশ্বকাপের মতো এবারও তাদের ফেভারিটের তালিকায় রাখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। এই জার্মানদের বিপক্ষে ঘরের মাঠের আসরে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়া ব্রাজিলকে বলা হচ্ছে ‘হট ফেভারিট’। বাছাই পর্ব পেরিয়ে সবার আগে রাশিয়ার মূল পর্ব নিশ্চিত করা সেলেসাওরা ‘হেক্সা’ মিশনে নামার আগে তাদের ক্ষমতার জানান দিয়েছে ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচের দাপুটে জয়ে।

ফেভারিটের তালিকায় রয়েছে স্পেন, ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনাও। স্প্যানিশদের সব ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু হঠাৎ করে তাদের কোচ জুলেন লোপেতেগিকে বরখাস্ত করায় এলোমেলো হয়ে গেছে সব। বিশ্বকাপের আগে এই ধাক্কা তারা কাটিয়ে উঠতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

ফ্রান্সে তারকার ছড়াছড়ি। আন্তোয়ান গ্রিয়েজমান, কাইলিয়ান এমবাপে, পল পগবা, উসমান দেম্বেলের মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া স্কোয়াডের বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখাটা বাড়াবাড়ি নয় মোটেও।

বাছাই পর্বের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। লাতিন আমেরিকা অঞ্চল থেকে বাছাইয়ের একেবারে শেষ দিনে মূল পর্বের টিকিট পায় লিওনেল মেসির জাদুকরী হ্যাটট্রিকে। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীকে ঘিরেই আলবিসেলেস্তেদের স্বপ্ন। গত বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে হারের দুঃখ ‍ভুলতে রাশিয়া নামছে দুইবারের চ্যাম্পিয়নরা।

ফেভারিটের তালিকায় হয়তো নেই; তবে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল, ‘সোনালি প্রজন্মের’ বেলজিয়াম, লুই সুয়ারেসের উরুগুয়ে, হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড কিংবা লুকা মদরিচের ক্রোয়েশিয়া চমক দেখিয়ে বিশ্বকাপ পরিসংখ্যানটা পাল্টে দিতে পারে। অঘটন ঘটিয়ে দিতে পারে মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, সেনেগাল, কোস্টারিকা, পোল্যান্ড ও কলম্বিয়ার মতো দলগুলো।

দুর্দান্ত সব দলের চমৎকার সব খেলোয়াড় নিয়ে শুরু হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপের উত্তাপ আগের আসরগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে বলেই ভাবা হচ্ছে। তবে রাশিয়ার ফুটবল মহাযজ্ঞ শুরুর আগেই কিন্তু আলো হারিয়েছে কিছুটা। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি ও দুইবারের ফাইনালিস্ট নেদারল্যান্ডসকে ছাড়াই যে হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ২১তম আসর। বাছাই পর্বের বাধাই পেরোতে পারেনি ইউরোপের দুই শক্তি।

তাতে বিশ্বকাপ উত্তেজনায় ভাটা পড়ছে কই! ফুটবল বিশ্ব আবারও কাঁপছে বিশ্বকাপ জ্বরে। মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টার জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু হওয়া ‘ফুটবল যুদ্ধে’ জমা আবেগ, উত্তেজনা, রোমাঞ্চের গোলা-বারুদ। ফুটবলপ্রেমীরা তৈরি তো?

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close