আলোচিত

প্রশাসনে শুরু হয়েছে চরম অস্থিরতা?

আলোচিত বার্তা : নির্বাচনী ডামাডোল শুরুর আগেই প্রশাসনে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই অস্থিরতা বিরাজমান। দলবাজি, ভীতি, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, অসন্তোষ এবং কারো কারো মধ্যে শুরু হয়েছে চরম অস্থিরতা।

এতোদিন প্রশাসনে জামায়াত-শিবির চিহ্নিতকরণ এবং স্বাধীনতাবিরোধী পাকড়াও এর কারণে কর্মকর্তাদের অস্থিরতা ছিল। এখন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ঢেলে সাজানো ইস্যুতে নতুন করে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। আবার রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের শঙ্কা তো রয়েছেই।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন। এর আলোকে সরকারের বিগত প্রায় ৯ বছরের উন্নয়ন চিত্র, মেগা প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ ও ফার্স্ট ট্র্যাকভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়নের চিত্র, সরকার প্রধানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গুলো জনগনের সামনে তুলে ধরতে বলা হয়েছে। বর্ধিত সভায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বিশ্ব সমর্থন অর্জন করেছি। এই সমর্থন নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।

হঠাৎ করে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের ‘আমলনামা এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’ নিয়ে গোপনীয় প্রতিবেদন তৈরির লক্ষ্যে অনুসন্ধান ইউএনওদের মধ্যে যেমন অস্থিরতা, অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে; তেমনি পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরকে সতর্ক করে ১৯ দফা নির্দেশনা, ১১১ নন-ক্যাডার সহকারী সচিব ও সিনিয়র সচিবের পদ সংরক্ষণের আদেশ স্থগিত এ সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন কর্মকর্তাদের অনেকেই।

জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনে সচিব আছেন ৭৮জন, অতিরিক্ত সচিব আছেন ৪৮৬জন, যুগ্ম-সচিব আছেন ৭৮২ জন, উপসচিব ১৭৬৪ জন, সিনিয়র সহকারী সচিব ১৪৬৩ জন, সহকারি সচিব ১১৫৯জন, বিভাগীয় কমিশনার ৮জন, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ১৪জন, ডিসি ৬৪জন, এডিসি ১৯২জন এবং ইউএনও ৪৪০ জন কর্মরত। বর্তমানে মাঠ প্রশাসনে ইউএনও পদে বিসিএস ২৭, ২৮, ২৯, এবং ৩০ ব্যাচের কর্মকর্তার কাজ করছেন। এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেককের বিরুদ্ধে দুনীতি অভিযোগ রয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সরকার চায় নিজ রাজনৈতিক বলয়ভুক্ত কর্মকর্তাদের ভোটের আগে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে বসাতে। এর মধ্যে বেশ কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা অবসরে যাবেন। তাদের পদে যাওয়া এবং নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে লবিং এর মধ্যই চলছে অস্থিরতা। কর্মকর্তারা অফিসে একে অপরের সঙ্গে এবং পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এ নিয়ে কথাবার্তা বলছেন। তারা আসন্ন নির্বাচনের আগে পক্ষ-বিপক্ষ চিহ্নিতকরণ এবং সামনে কি হবে তা নিয়ে নিজেদের অস্থিরতা প্রকাশ করছেন।

ইউএনও›দের রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে গোপনীয় প্রতিবেদন নিয়ে মাঠ প্রশাসনে চলছে তোলপাড়। যোগ্যতার মাপকাঠিতে চাকরি নিয়ে এতোদিন দায়িত্ব পালনের পর হঠাৎ করে কেন ‘রাজনৈতিক আমলনামা’ খোঁজা শুরু হলো সে রহস্য খুঁজতে গিয়ে তাদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে।

সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের শিক্ষাজীবনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও তাদের পরিবার বা নিকটাত্মীয়দের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয় অনুসন্ধান চালাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো সব জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ সুপারদের। গত ২৭ জুন ইস্যু করা ওই চিঠিতে পহেলা জুলাইয়ের মধ্যে একজন ইন্সপেক্টর বা পরিদর্শক পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করতে এবং এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও সতর্কতা বজায় রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তবে উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা-ইউএনও’রা এই তথ্য জেনে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। চিঠিতে ইউএনওদের সম্পর্কে যেসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়, তার মধ্যে রয়েছে কর্মকর্তা ও তার পিতার নাম পরিচয়, স্থায়ী ও কর্মস্থলের থানার রেকর্ড, তিনি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন ও সেখান রাজনীতি করেছেন কি-না, রাজনৈতিক মতাদর্শ, পরিবার বা নিকটাত্মীয়দের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলে সে সম্পর্কে তথ্যসহ আরও কয়েকটি বিষয়।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদ কথা বলতে রাজি হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ইউএনও বলেন, নিজ যোগ্যতায় ইউএনও হয়েছি। এখন পুলিশ দিয়ে এ ধরনের অনুসন্ধান করানো অসম্মানজনক।

সম্প্রতি ক্যাডার বহির্ভহৃতদের জন্য সহকারী সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিবের ১১১টি পদ সংরক্ষণ করা হয়। ২২ মে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করার পর ‘পদ সংরক্ষণের’ ওই আদেশ ৩১ মে স্থগিত করে আরও একটি আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই স্থগিতাদেশে চার ক্যাটাগরির কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে ক্ষুব্ধ হন সচিবালয়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারিরা।

এদের মধ্যে রয়েছে প্রথম শ্রেণির সহাকারী সচিব, দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। নন-ক্যাডার সহকারী সচিব ও সিনিয়র সহকারি সচিবের ১১১টি পদ সংরক্ষণের আদেশ স্থগিতকে ‘চাকরিজীবীদের সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে ষড়যন্ত্র চলছে’ এমন মন্তব্য করেছেন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। এর ধারাবাহিকতায় এবার পাঁচ দফা দাবিতে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারি সংযুক্ত পরিষদ।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, তারা দাবির কথা বলেছে আমি শুনেছি।

এদিকে, নাশকতা-হামলার আশঙ্কায় সারাদেশে পুলিশের থানা ও চেকপোষ্টসহ সকল স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করতে সর্তক করে নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে সর্তক করে ১৯ দফা নির্দেশনা দিয়ে সম্প্রতি পুলিশেল সকল ইউনিটে ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সাথে নির্দেশনাটি র‌্যাব মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি ও পুলিশ কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তবে এ নিয়ে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। ১৯ দফা নির্দেশনায়র সব শেষ দফায় বলা হয়েছে এ সংক্রান্তে ‘বাংলাদেশ পুলিশ সদস্য ও স্থাপনা সংক্রান্ত নিরাপত্তা নির্দেশিকা’ অনুসরণ করতে হবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশের মাঠ প্রশাসন ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। আগামী ২৪ জুলাই জেলা প্রশাসক সম্মেলন হবে। ওই সম্মেলনে প্রশাসনের দিক নির্দেশনা দেয়া হবে। বিগত ডিসি সম্মেলনে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেগুলোর বাস্তাবায়ন কতটুকু হয়েছে তা নিয়ে যেমন বিশ্লেষণ চলছে; তেমনি ডিসিদের দাবি দাওয়া পুরণ নিয়েও অসন্তোষ আছে। ওই সম্মেলনের পর পরই ২২ জেলায় নতুন ডিসি পদায়ন করা হবে বলে জানা গেছে। সারাদেশে ৪৯২টি উপজেলায় ইউএনও পদেও পরিবর্তন আনা হবে। ইতোমধ্যে মাঠ প্রশাসনে কর্মরত থাকা ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের এসিআর ও শৃংখলা আমলনামা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এসেছে।

সুত্র জানায়, ‘নির্বাচনী’ প্রশাসন সাজানো হবে। এ লক্ষ্যে সরকারের শীর্ষ সচিব পদগুলোতে রদবদল আনা হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুরু হবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দিয়ে। এ ছাড়াও মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ, স্থানীয় সরকার, এনবিআর চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমম্বয়ক, সুরক্ষা ও সেবা সচিবসহ আরো কিছু পদ রদবদলের তালিকায় রয়েছে। এই তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে। এরপরেই জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদেও রদবদল হতে পারে।

জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবের চাকরির মেয়াদ নির্বাচনের ঠিক আগে নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুতে শেষ হচ্ছে। তাই আগেভাগেই প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে পরিবর্তন আনা হতে পারে।

হঠাৎ করে নতুন নতুন আদেশ নির্দেশ এবং নানামুখী নজরদারী এবং আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে ‘রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ’ তা নিয়ে প্রশাসনে কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। সচিবালয়ে প্রবেশ করলে সেটা বোঝা যায়।

একাধিক সাবেক আমলার সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কথা বললে তারা জানান, মূলত প্রশাসনকে অধিক রাজনীতিকরণের কারণে এমন অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ দলীয়করণের কারণে অনেকের ভয় রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। আবার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের লোকজন বসিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টাও হয়। তবে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের (ইউএনও) রাজনৈতিক যোগসুত্র খোঁজায় তারা বিক্ষুব্ধ হবেন সেটাই স্বাভাবিক।

 

সূত্র:ইনকিলাব

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close