অন্যান্য

ব্রিটিশরা কেন নেপাল দখল করেনি

ভিন্ন বার্তা : ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নেতা লর্ড ক্লাইভের হাতে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। এর ফলাফল হিসেবে ইংরেজরা বাংলা দখল করে নেয়। পরবর্তী একশ বছরে ইংরেজরা পুরো ভারতবর্ষকে দখল করে নিয়েছিল।

এ ঘটনার সমান্তরালে আরেকটি সম্প্রসারণবাদী শাসনকেন্দ্র বিকশিত হচ্ছিল কাঠামান্ডু উপত্যকা থেকে কয়েক মাইল দূরে। একজন উচ্চাভিলাষী গোর্খা রাজার উত্থান ঘটেছিল এবং তিনি নিজের রাজত্ব সম্প্রসারণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। এই গোর্খা রাজার নাম ছিল পৃথ্বী নারায়ণ শাহ, তাকে আধুনিক নেপালের পিতা হিসেবে অভিহিত করা হয়। ছোট ছোট রাজ্য ও কাঠমান্ডু উপত্যকাসহ সংলগ্ন অঞ্চলগুলো দখল করে তিনি নেপাল রাষ্ট্রের বীজ তৈরি করেন।

সে আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে দুটি মাত্র বিকাশমান সামরিক শক্তির উপস্থিতি ছিল : একটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং অন্যটি নেপালের গোর্খালি সেনাবাহিনী। এ দুই শক্তি একসময় সংঘাতে লিপ্ত হয়। ১৮১৪-১৬ সালে এ দুই শক্তির মধ্যে এক স্মরণীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা ইতিহাসে অ্যাংলো-গোর্খা যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধে হেরে গোর্খালিদের রাজত্ব সম্প্রসারণ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এ পরাজয় গোর্খা শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।

১৮১৪-১৬ সালেই এ দুই শক্তি প্রথমবারের মতো যুদ্ধ করেনি। এর আগে ১৭৬৭ সালে উভয় পক্ষ একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। সে সময় কাঠমান্ডু উপত্যকার রাজার সঙ্গে ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাই গোর্খালি সেনারা কাঠমান্ডুর রাজাকে আক্রমণ করলে ব্রিটিশরা তার পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে। ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন কিনলক। এই কিনলক গোর্খালিদের হাতে অবমাননাকর পরাজয় বরণ করেন এবং তার এক হাজারের বেশি সেনা নিহত হয়। ইংরেজ সেনারা রণাঙ্গন থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ রেখেই পালিয়ে যায়। এ ঘটনা ‘দ্য কিনলচ এক্সপেডিশন’ নামে স্মরণীয় হয়ে আছে।

বিকাশের চূড়ান্তকালে নেপালের সীমান্ত কাঙ্গরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, শিমলা ও দেরাদুনও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল; পশ্চিম দিকে ছিল তিস্তা নদী; পূর্ব দিকে ছিল দার্জিলিং ও সিকিম। ১৭৬৭ সালের পরাজয়ের পর ব্রিটিশরা গোর্খালিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষকে এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করে।

কিন্তু গোর্খালি সেনাবাহিনীর নিজস্ব সমস্যা ছিল। এই সেনাবাহিনী গড়ে উঠেছিল জায়গির ব্যবস্থার মাধ্যমে। এর অর্থ হলো নতুন দখল করা এলাকা থেকে আদায় করা কর থেকে এই সেনাবাহিনীর খরচ বহন করা হবে। যেহেতু রাজকোষ থেকে তাদের বেতন দেয়া হতো না, তাই নিজেদের জীবিকা নিশ্চিত করতে গোর্খালিদের নতুন নতুন এলাকা দখলে যুদ্ধ করতে হতো। কারণ সেনাবাহিনীর আকার বড় হচ্ছিল, তাই খরচও বাড়ছিল।

লোভ ইতিহাসে বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা রেখেছে। গোর্খালিদের ইতিহাসেও রেখেছে। গোর্খালি সেনারা ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে থাকা অওধ রাজ্য আক্রমণ করলে যুদ্ধ করা ব্যতীত ব্রিটিশদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। প্রাথমিকভাবে যুদ্ধে ব্রিটিশরা সুবিধা করতে পারছিল না। খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য ব্রিটিশরা তাদের ছয়জন জেনারেলের চারজনকে বরখাস্ত করে। একজন মারা যান এবং বাকি থাকেন শুধু ডেভিড অকটারলনি। তিনিই ছিলেন ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকা শেষ বড় পদমর্যাদার সমরনেতা।

অস্ত্র ও সেনা সংখ্যায় পিছিয়ে থাকলেও গোর্খা সেনারা তাদের ঐতিহ্য অনুসারে বীরত্বের সঙ্গে লড়ে যেতে থাকে। শেষমেশ তারা প্রতারণা ও নিজেদের বাহিনীর ত্রুটিপূর্ণ কাঠামোর কারণে ব্রিটিশদের কাছে হেরে যায়। যুদ্ধরত গোর্খালি বাহিনীর সব সদস্যই পাহাড়ের ছিল না, বরং তাদের দখল করা নতুন নতুন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা সেনারাও ছিল। এই ভিন্ন এলাকার, ভিন্ন জাতের সেনারা গোর্খালি সেনানায়কদের প্রতি অনুগত ছিল না। ব্রিটিশরা এই পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিল এবং তারা এর সুযোগ নেয়। অনেক সেনা গোর্খালিদের পক্ষ ত্যাগ করে এবং গোর্খালিরা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই অ্যাংলো-গোর্খা যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে গোর্খালি সেনাবাহিনীর ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।

ব্রিটিশদের কাছে নেপাল ছিল এক দুর্গম, মশা উপদ্রুত, রহস্যময় এলাকা। ব্রিটিশদের কাছে নেপাল ছিল একদল বর্বর জাতির মানুষের আবাস। এই বর্বরদের অধীনস্থ করার ইচ্ছা তাদের অনেকের ছিল না। কিন্তু তার পরও নেপাল দখল করা নিয়ে ব্রিটিশদের আগ্রহ ছিল। কারণ বাণিজ্যের প্রয়োজনে কাঠমান্ডু হয়ে তিব্বত পর্যন্ত ব্রিটিশদের পথ প্রয়োজন ছিল। তাই নেপালে তাদের বন্ধু শাসক দল প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া কাঠমান্ডুতে ব্রিটিশদের এমন শাসকের দরকার ছিল যে, নেপালের বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। কাঠমান্ডুতে ব্রিটিশদের একটি আবাসস্থল গড়ে তোলাটা ব্রিটিশদের ইচ্ছাকে সহজে বাস্তবায়িত করে দিয়েছিল। নেপালের শাসকরা ধীরে ধীরে ব্রিটিশদের অধীন চলে এসেছিল এবং এটা নেপালের শাসকরা অনুভবও করতে পারেনি।

ব্রিটিশদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল গোর্খালিদের মতো শক্তিশালী কোনো সেনাবাহিনী যেন কোনো অবস্থাতেই আর নেপালে গড়ে না ওঠে। নেপাল যেন কোনো অবস্থাতেই শক্তিশালী শক্তি হয়ে না উঠতে পারে, সেজন্যই ব্রিটিশরা এমনটা চাইছিল। ব্রিটিশরা যুদ্ধের ময়দানে গোর্খাদের সাহসিকতাকে ভালোভাবেই দেখেছিল। তাই তারা গোর্খাদের নিজেদের বিরুদ্ধে দেখতে চায়নি বরং তারা চেয়েছিল গোর্খাদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে। তাদের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে যুক্ত করতে ব্রিটিশরা এক মোক্ষম চাল চেলেছিল।

অ্যাংলো-গোর্খা যুদ্ধের পর দুপক্ষের মধ্যে ‘সিগুলি চুক্তি’ হয়েছিল। দুপক্ষই যুদ্ধের ইতি টানতে এ চুক্তি করেছিল। এ চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা তাদের চাওয়া পূরণ করে নিয়েছিল। ব্রিটিশরা নেপালে আর উপনিবেশ স্থাপন করতে চায়নি, কারণ তাহলে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরো জটিল হয়ে যেত। উপনিবেশ স্থাপন করলে দায়িত্ব নিতে হয়। বরং ‘সিগুলি চুক্তি’র মাধ্যমে তারা গোর্খাদের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে যুক্ত করার অধিকারসহ আরো বেশকিছু সুবিধা পেয়ে যায়। ফলে ঔপনিবেশিক শাসক হিসেবে দায়িত্ব না নিয়েই ব্রিটিশরা নেপালের সম্পদের ওপর অধিকার পেয়ে গেল। পুরো নেপালের সম্পদ ব্রিটিশদের ভোগের জন্য তৈরি হয়ে গেল। ব্রিটিশদের জন্য এটা ছিল দূরদর্শী চাল আর নেপালি শাসকদের জন্য ছিল ব্যক্তিস্বার্থের জন্য জাতির স্বার্থকে বিকিয়ে দেয়া। নেপালকে উপনিবেশে পরিণত করলে তা কমনওয়েলথের সদস্য হয়ে যেত আর তখন গোর্খা সেনাদের ব্রিটিশ সেনাদের সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে হতো। কিন্তু বিনামূল্যে পেলে কে আর মূল্য দিতে যায়! ব্রিটিশরা সেটাই করেছিল। এজন্যই ব্রিটিশরা কখনো নেপালকে উপনিবেশে পরিণত করেনি।

গোর্খারা আজকের দিনেও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কাজ করে। দুইশ বছর ধরে ব্রিটিশ ও গোর্খাদের এই মিলিত পথচলার বিষয়টি নেহাত কম আশ্চর্যের বিষয় নয়। যোগ দেয়ার পর থেকে ব্রিটিশদের সব যুদ্ধেই গোর্খারা অংশ নিয়েছে। এই বিশ্বাস, আনুগত্য গোর্খাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যা টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।

নেপালিরা গোর্খা সেনা হয়ে গর্ব অনুভব করে। সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গেই তারা তাদের এই ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করে।

১৯৪৭ সালে যুক্তরাজ্য, ভারত ও নেপালের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুসারে গোর্খাদের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে যুক্ত রাখার শর্ত ছিল। চুক্তিতে বলা আছে, কোনো অবস্থাতেই গোর্খাদের মার্সেনারি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এছাড়া জেনেভা কনভেনশনের দুটি অনুচ্ছেদ দ্বারাও গোর্খাদের মার্সেনারি হিসেবে গণ্য না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মার্সেনারিরা কোনো দেশের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে কাজ করতে পারে না। কিন্তু গোর্খারা যুক্তরাজ্য ও ভারতের নিয়মিত সেনাবাহিনীতেই কাজ করে। আর গোর্খা সেনাদের পরিবার চাইলেই ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিতে পারে। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে মোট দশটি গোর্খা রেজিমেন্ট ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর গোর্খাদের ছয়টি রেজিমেন্ট ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় এবং বাকি চারটি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

 

সূত্র: এশিয়া টাইমস

আরও দেখুন

এরকম আরও খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এটাও পড়ুন

Close
Close